ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর দিনিপ্রো শহরের একটি ব্যস্ত রেলস্টেশনে ড্রোন হামলায় ১৪ জন নিহত হন।
একই দিন চেরনিহিভ ও ক্রেমেনচুক শহরে হামলায় আরো পাঁচজন নিহত হন। রাতে রাজধানী কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজনের মৃত্যু হয়। দেশটির কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
রয়টার্স জানায়, একদিনে একের পর এক হামলায় ইউক্রেনজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলে ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় এই যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে আবারও শান্তি আলোচনা শুরুর আশা তৈরি হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেৎস্কি টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। তারা ট্রেন, রেলস্টেশন ও আবাসিক ভবনে হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, এসব হামলার কোনো যুক্তি নেই এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পক্ষে কোনো ব্যাখ্যাও থাকতে পারে না।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসন জানায়, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার কিছু আগে শহরের কয়েকটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে একজন নিহত হন এবং কয়েকটি গুদামে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া দিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে একটি ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানান।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার এসব হামলাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সবাই যখন উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের অপেক্ষায়, তখনই রাশিয়া হামলা চালাচ্ছে।
জেলেনস্কি আরো বলেন, রাশিয়া নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ইউক্রেনের গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এ বিষয়ে তিনি মিত্রদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে ছয় দিনের যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি শুধু ওই অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর থেকে শহরটি যুদ্ধের মধ্যে আটকে রয়েছে।
ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়া হামলা বাড়াচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। দিনিপ্রো শহরের প্রধান রেলস্টেশনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় জেট ইঞ্জিনচালিত একটি ড্রোন প্ল্যাটফর্মে আঘাত হানে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা উক্রজালিজনিতসিয়া এ তথ্য জানিয়েছে।
হামলার পর প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মরদেহ ও বিস্ফোরণের ধাতব টুকরা। মেঝেতে জমে ছিল রক্ত। এ সময় বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজছিল। এর মধ্যেই পুলিশ কালো ব্যাগে মরদেহ সরিয়ে নিচ্ছিল। স্টেশনের নিচে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন ৬৭ বছর বয়সী স্বিতলানা শেরবাক। তিনি বলেন, ‘আর এসব কেন? তারা আসলে কী অর্জন করতে চাইছে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
দিনিপ্রো শহরের আরেকটি হামলায় শিক্ষার্থীদের একটি আবাসিক ভবনে আগুন ধরে যায়। আঞ্চলিক গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা এ তথ্য জানান। তিনি আরো বলেন, বৃহস্পতিবারের হামলায় শহরটির তিন লাখ ৫০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার হামলায় নিয়মিত বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন। তবে মস্কো সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় শান্তি আলোচনা শুরুর চেষ্টা চলছে। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে নতুন করে হামলা চালানো হলো। আগামী মাসে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারও ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে ইউক্রেনের মিত্র দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির শীর্ষ উপদেষ্টা কিরিলো বুদানভসহ দেশটির কর্মকর্তারা। তাদের মতে, রাশিয়ার হামলা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক চাপ আরো বাড়ানো প্রয়োজন।