নামে মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী সভাপতি-সম্পাদকসহ অধিকাংশ সদস্যই প্রকৃত মৎস্যজীবী নন। কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।বিলের পানি ছাড়া হলে ও শত শত কৃষকদের নষ্ট করা হবে। এ নিয়ে ইজারাদার ও কৃষকদের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে রয়েছে।
তাঁদের নামেই বছরের পর বছর ইজারা হচ্ছে সরকারি জলমহাল। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জলমহাল নিয়ন্ত্রণ, ইজারার শর্ত ভঙ্গ, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মাছ চাষের ব্যক্তিগত ঘেরের নেট-ঘাট তুলে নিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ লুটের অভিযোগও উঠেছে সমিতির কয়েকজন আওয়ামীলীগের নেতার বিরুদ্ধে।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের
জালিয়া গ্রামের সোনারতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’কে ঘিরে এসব নানা অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ উপজেলার পাগনা বড়বিল (বন্ধ) জলমহালে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে মাছ ধরার প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগে ঘটনায় জালিয়া ও ছাতরপাই গ্রামবাসীর মধ্যে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যে কোনো মুহুতে ভয়াবহ সংঘষের আশংকা বিরাজ করছে।
এ ঘটনায় প্রকৃত মৎস্যজীবী ও স্থানীয়দের মধ্যে দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে।
অভিযোগের প্রতিকার, মাছের ক্ষতিপূরণ, অবৈধভাবে মাছ আহরণের প্রস্তুতি বন্ধ এবং ইজারা প্রক্রিয়া তদন্তের দাবিতে গত ২৯ অক্টোবর সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক, ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আনছার মিয়া ও মিসবাহ উদ্দিন।
ছাতক উপজেলার ভাতগাও ইউপির ছাতরপাই গ্রামের আনছার মিয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, তিনি একজন কৃষক ও মৎস্যজীবী। গ্রামের কয়েকজন অসহায় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ১০ বছর ধরে নিজেদের ও অংশীদারদের মৌরসি এবং দখলীয় জমিতে নেট দিয়ে ঘের তৈরি করে মাছ চাষ করে আসছে। বর্ষার আগে মাছ বড় হলে সেগুলো আহরণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাঁরা।
কিন্তু গত ১৮ অক্টোবর সোনারতরী মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মিরাস আলী, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা লুৎফুর রহমান এবং ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আলী আসকরের নেতৃত্বে একদল লোক তাঁর মাছ চাষের ঘেরে প্রবেশ করে। এ সময় জোরপূর্বক ঘেরের দুই পাশের নেট ও ঘাট তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আনছার মিয়ার দাবি, এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার উৎপাদিত মাছ, সংরক্ষিত মাছ ও মাছের পোনা নষ্ট ও লুটপাট হয়। কিছু মাছ বিভিন্ন জলাশয়ে চলে যায়। এতে তিনি ও তাঁর অংশীদাররা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এব্যাপারে দক্ষিন সাদারাই গ্রামের আব্দুর রউফ,আব্দুল কাইয়ুম,সালিক মিয়া,আকির আলী,পাগনার পাড় গ্রামের নছির উদ্দিন,নুরুল আমিন,আলীম খা,ছাতারপই আনছার আলী,ছামির আলী জালিয়া গ্রামের,মিনারা মিয়াসহ অর্ধশতাধিক লোকজন
তারা অভিযোগে দাবি করেন, সোনারতরী সমিতির সদস্যদের অনেকেই প্রকৃত মৎস্যজীবী নন। গত ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পাগনা বড়বিলসহ বিভিন্ন জলমহাল ইজারা নিয়ে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ভোগদখল করে লুটপাট চালায়। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিপূরণ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা দাবি করেছেন তিনি।
ডিফল্টার ঘোষণার পরও কীভাবে ইজারা?
সোনারতরী সমিতির ইজারা নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে আদালতের আদেশ ও সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৯ ঘিরে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় সংশ্লিষ্ট বিলটি ছয় বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ও আশার আলো সমবায় সমিতির দায়ের করা তথ্য গোপনের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সোনারতরী সমিতিকে ডিফল্টার ঘোষণা করে ইজারা বাতিল এবং নতুন করে দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, আদালতের আদেশে ডিফল্টার ঘোষিত হওয়ার পরও কীভাবে সমিতিটি পুনরায় দরপত্রে অংশগ্রহণ করে ইজারা পেল? সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৯ অনুযায়ী ডিফল্টার হিসেবে চিহ্নিত সমিতির ইজারায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি কী ছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পাগনা বড়বিলের ইজারা নিয়ে আদালতে মামলা
শান্তিগঞ্জ উপজেলার হরিনগর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন তাঁর অভিযোগে উল্লেখ করেন, ভাতগাঁও ইউনিয়নের পাগনা বড়বিল জলমহালটি ১৪৩৩ থেকে ১৪৩৫ বাংলা সন পর্যন্ত তিন বছরের জন্য জালিয়া গ্রামের সোনারতরী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ইজারা দিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন।
তবে ইজারা প্রদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগে পিটিশন নম্বর ১১৫৬৩ দায়ের করা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আদালত আদেশ জারি করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
মিসবাহ উদ্দিনের অভিযোগ, সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৯ ও ইজারা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে মাছ সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। অথচ প্রথম বছরেই মাছ ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিলের পাড়ে মাছ ধরার জাল, দড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গভীর রাতে বিলের পানি শুকিয়ে মাছ আহরণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
‘বর্ষায় মাছ ধরলে জাল পুড়ায়, বিল শুকালে বাধা নেই’
পাগনা বড়বিল এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৎস্যজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা বর্ষাকালে মাছ ধরতে গেলে জাল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ এখন বিল শুকিয়ে মাছ ধরলেও তাদের কিছু হয় না। টাকা থাকলে এ দেশে সবকিছু করা যায়। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছর পর হাওরে আর দেশীয় মাছ পাওয়া যাবে না। বিষ দিয়ে মাটির তলা থেকেও মাছ বের করা হচ্ছে। আগের মতো এখন আর মাছ পাওয়া যায় না।’
ধ্বংসের মুখে দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য
হাওরবেষ্টিত ছাতক উপজেলায় একসময় রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, শোল, গজার, কালিবাউশ, টেংরা, পাবদা, শিং ও মাগুরসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। শামুক, ঝিনুক, কচ্ছপসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীরও সমৃদ্ধ আবাসস্থল ছিল এ অঞ্চল।
কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে জলাশয় শুকানো, বিষ প্রয়োগ, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের ব্যবহার এবং মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ আহরণের কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার হুমকির মুখে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন, কোথাও রাসায়নিক প্রয়োগ করে কাদামাটির নিচ থেকে মাছ বের করে নিধন করা হচ্ছে। এতে শুধু মৎস্যসম্পদ নয়, হাওরের সামগ্রিক জলজ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সমিতির নামে ইজারা, সুবিধা ভোগ করছে কারা?
প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করতেই সরকারি জলমহাল মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির মাধ্যমে ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সমিতির নামে ইজারা নেওয়া হলেও বাস্তবে জলমহালের নিয়ন্ত্রণ ও সুবিধা ভোগ করছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এতে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি রাজস্ব আদায় ও জলমহাল ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলেই ইজারাসংক্রান্ত অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও তদন্তের দাবি
জলমহাল শুকিয়ে মাছ আহরণ এবং ইজারা চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, যেসব জলমহাল শুকিয়ে মাছ আহরণ করা হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইজারাদারদের জামানত বাজেয়াপ্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ইজারাদাররা জলমহাল শুকিয়ে মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট করে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করেছেন। তাঁদের লিজ বাতিল করা হবে। কোনো অজুহাত দেখিয়ে ইজারাদারদের বিল শুকিয়ে মাছ ধরার সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান।
এ ব্যাপারে ছাতক থানার ওসি কামাল হোসেন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইউএনও মহি উদ্দিন বলেন, তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রকৃত মৎস্যজীবীদের দাবি, শুধু পাগনা বড়বিল নয়, ছাতকের সব সরকারি জলমহালের ইজারা, দরপত্র, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। আনছার মিয়ার ১০ লাখ টাকার মাছ লুটের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মিসবাহ উদ্দিনের উত্থাপিত ইজারা শর্ত ভঙ্গ ও আদালতের আদেশসংক্রান্ত বিষয়গুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এছাড়া ছাতক উপজেলার সচেতন মহলের দাবি,, জলমহাল কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের সম্পদ। মৎস্যজীবী সমিতি কোনো প্রভাবশালীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার রক্ষার সংগঠন। যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, জলমহালের অধিকার তাঁদেরই প্রাপ্য। নাম সর্বস্ব সমিতির আড়ালে প্রভাবশালীদের দখলদারত্ব বন্ধ না হলে একদিকে যেমন প্রকৃত মৎস্যজীবীরা নিঃস্ব হবেন, অন্যদিকে ধ্বংস হবে ছাতকের ঐতিহ্যবাহী হাওরের মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য।