ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ফের রবিবার দিনভর শ্রমিকরা অসন্তোষ। তারা আগুন জ্বালিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ রেখে পুলিশ বক্স, কারখানা, ব্যাংক, যানবাহন ও দোকানপাট ভাংচুর করে। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

এছাড়াও একটি কারখানার গোডাউন, মার্কেট ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্দ শ্রমিকরা। এসময় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে ওসিসহ বেশ কয়েকজন আহতের ঘটনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

এলাকাবাসী, শ্রমিক ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ ও সফিপুর আনসার একাডেমির ৩ নম্বর ফটক এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে।

প্রায় ৬ ঘণ্টা পর ওই মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতেই তারা এই আন্দোলন করে আসছেন। এর পরের দিন রবিবার সকালেও কর্মস্থলে না গিয়ে একই দাবীতে ফের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন পোশাক শ্রমিকরা।

সকাল ৮টার দিকে উপজেলার রতনপুর এলাকার করনী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবস্থান করে। পরে উপজেলার তেলিচালা, মৌচাক, সফিপুর বাজার, পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরাও বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। এসময় তারা বিভিন্ন কারখানার মূল ফটকে ভাংচুর চালিয়ে শ্রমিকদের বাইরে বের করে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সব কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা নানা শ্লোগানে এসব এলাকায় মহাসড়কটি অবরোধ রেখে লাঠিসোটা হাতে বিক্ষোভ মিছিল করে। কিন্তু ওই মহাসড়কের মৌচাক এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ বক্স ভাংচুর চালায় বিক্ষুব্দ শ্রমিকরা। এরপর তারা সফিপুর এলাকায় মহাসড়কে থাকা একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। পরে পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ রাখে যমুনা ব্যাংকের একটি শাখা, দোকানপাটসহ বিভিন্ন যানবাহন ভাংচুর চালায়।

এসময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কালিয়াকৈর থানার ওসি শহিদুল ইসলামসহ বেশ কিছু পুলিশ ও শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, উত্তেজিত শ্রমিকরা পাশে ট্রফিক্যাল লিমিটেড নামে একটি পোশাক কারখানার গোডাউন ও একটি মার্কেটে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু আগুনের খবর পেলেও শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ঘটনাস্থলে যেতে পারেনি বলেও জানিয়েছেন কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম। ততক্ষণে আগুনে ওই গোডাউন ও মার্কেটের কয়েকটি দোকান পুড়ে যায়।

এরপর ওই এলাকায় মহাসড়কে থাকা অপর একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন শ্রমিকরা। এ উত্তাল ঘটনায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ ঘটনায় ঢাকা-–টাঙ্গাইল মহাসড়কে দিনভর যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে থাকে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন এ পথে চলাচলকারী পরিবহন শ্রমিক ও শিশু, বৃদ্ধসহ নানা বয়সের যাত্রীরা। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গাজীপুরে পাঁচ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পরে কালিয়াকৈর থানা, মৌচাক ফাঁড়ি, শিল্প পুলিশ ও বিজিবি’র যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিক্ষুব্দ শ্রমিকরা বলেন, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলেও আমাদের বেতন বাড়েনি। বর্তমানে বাজারে সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় কম বেতনে সংসার অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এ কারণে নূন্যতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবীতে আমরা রাস্তায় নেমেছি। আমাদের বেতন বাড়াতে হবে, তা না হলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।

এব্যাপারে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, সকাল থেকেই শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ রেখে আন্দোলন করছেন। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে পিকেটারদের ইটের আঘাতে আমিসহ কয়েকজন পুলিশ আহত হন। শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

গাজীপুর শিল্প-২ পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থানা, শিল্প পুলিশ ও বিজিবি কাজ সদস্যরা কাজ করছেন। তবে বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য বিকেল সোয়া ৩টা পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।