সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের যমুনা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা মটিয়ারপুর চরে চলছে নির্বিচারে মাটি ও বালু কাটা। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও ইজারাদারের ছত্রচ্ছায়ায় এবং কতিপয় নেতার প্রভাবে এই অবৈধ কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে চরের ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে, আর চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন চরের ওপর নির্ভরশীল খেটে খাওয়া মানুষ। আর নদীতে জেগে ওঠা চর কাটা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংঘর্ষের আশংকা।
সরেজমিন জানাগেছে, জেলা প্রশাসক কর্তৃক অনুমোদিত বালু মহলের ইজারা পয়েন্টগুলো হলো-শিমলা, জিআর পাড়া ও চন্ডাল বয়ড়া। অথচ এই নির্দিষ্ট সীমানা ও সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সয়দাবাদ থেকে কাজিপুরের আফানিয়া এলাকা পর্যন্ত যমুনার বিশালজুড়ে চলছে অবৈধ মাটি ও বালু কাটার রাজত্ব।
অভিযোগ রয়েছে, ইজারাদার হাজী আব্দুস সাত্তারের নাম ভাঙিয়ে এবং তার নিয়োজিত লোকজন ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এই অপকর্ম চলছে। বালু মহলের বাইরে অবস্থিত মটিয়ারপুর মৌজা থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কেটে প্রতিদিন টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি। দেখা গেছে, গভীর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারি সারি নৌকায় করে মটিয়ারপুর চর থেকে মাটি ও বালু বোঝাই করে তা পাঁচঠাকুরী নৌকা ঘাটে স্তূপ করা হচ্ছে। সেখান থেকে ট্রাকে করে ওই মাটি বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ ও সরকারি নিয়মবহির্ভূত। নৌকাযোগে মাটি আনা এবং তার হিসাব তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন হাজী আব্দুস সাত্তারের নিয়োজিত যুবক সাব্বির হোসেন প্রান্ত এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন।
যমুনার ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে মটিয়ারপুর চরটি জেগে ওঠার পর সেখানে বাদাম, কলাইসহ বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন স্থানীয় কৃষকরা। কিন্তু হঠাৎ করে এই মাটি কাটা শুরু হওয়ায় তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনটুকু ধ্বংস হতে বসেছে।
মটিয়ারপুর চরের বাসিন্দা মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে মোতাহার হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “যমুনা নদীর ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়ে শুভগাছা আফানিয়ার চরে ঝুপড়ি ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। চর জেগে ওঠায় সেখানে আবাদ করে কোনোমতে বেঁচে আছি। কিন্তু প্রভাবশালীরা চর কেটে নেওয়ায় আমাদের জীবিকার পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মাটি কাটতে নিষেধ করলে পশ্চিম পাড়ের বালু খেকোরা বলে-আমরা হাজী আব্দুস সাত্তারকে নৌকা প্রতি ৭০০ টাকা দিয়ে মাটি নিচ্ছি। তিনি নিষেধ না করলে আমরা বন্ধ করব না।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর বলেন, “চরে আবাদ করে আমাদের সংসার চলে। কিন্তু নির্বিচারে মাটি কাটায় আবাদ করতে পারছি না। বাধা দিলে উল্টো হাজী সাত্তারের নাম ও টোকেনের ভয় দেখানো হয়।
ছোনগাছা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি ফরহাদ হোসেন কালু বলেন,চরে চাষাবাদ করে গরিব ও অসহায় মানুষগুলো জীবিকা নির্বাহ করে। এভাবে চর কেটে উজার করলে চরের মানুষকে না খেয়ে মরতে হবে।
মাটি কাটার শুরুতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে মাটি কেটে বিক্রি করা হলেও কাউকে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কর্তৃক যমুনার মটিয়ারপুর চরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া দ্রুত বন্ধ না হলে অচিরেই বড় ধরনের নদী ভাঙন ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় মহল। যেকোর সময় হতে পারে বড় ধরনের সংঘর্ষ।
এবিষয়ে ইজারাদার হাজী আব্দুস ছাত্তারকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
অপরদিকে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভুমি) আব্দুল্লাহ-হেল মাফি বলেন,ইজারাদেয়া জায়গার বাহিরে থেকে কোন প্রকার বালি বা মাটি কেটে নেয়ার বিধান বা কোন সুযোগ নেই। আর নদীর চর কেটে নেয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা। বিষয়টি ইতোমধ্যে াবগত হয়েছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয়দের মতে অবিলম্বে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গস্খহণ করা হোক।