দক্ষিণ টরিড উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ সক্রিয়তার সময় চলছে। এ উপলক্ষে আজ (৫ নভেম্বর) রাতে আকাশে কয়েকটি উজ্জ্বল অগ্নিগোলকের মতো উল্কা দেখা যেতে পারে। রাত জেগে আকাশ পর্যবেক্ষণ করলে এই বিরল দৃশ্য দেখার সুযোগ রয়েছে।
দক্ষিণ টরিড উল্কাগুলো ঘণ্টায় প্রায় ৬৫ হাজার মাইল বা ১ লাখ ৪ হাজার ৬০৭ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। অরায়নিডের মতো অন্যান্য উল্কাবৃষ্টির তুলনায় এগুলো ধীরে চলে। ফলে আকাশে দীর্ঘ সময় ধরে দৃশ্যমান থাকে।
এসব উল্কার আলোর রেখা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ হয়। এগুলোকে বৃষ (টরাস) নক্ষত্রমণ্ডল থেকে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের দিকে উল্কা দেখার সবচেয়ে ভালো সুযোগ থাকতে পারে। আর আর্থস্কাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, ৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেল ৩টার দিকে এর সর্বোচ্চ সক্রিয়তা দেখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার উল্কাপিণ্ড পরিবেশবিষয়ক কার্যালয়ের প্রধান বিল কুক বলেন, টরিড উল্কাবৃষ্টির বিশেষত্ব হলো, এতে উজ্জ্বল অগ্নিগোলকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, এ ধরনের উল্কা খুব বেশি দেখা যায় না। তবে একবার দেখা গেলে তা দীর্ঘদিন মনে থাকে। আকাশজুড়ে উজ্জ্বল আলোর রেখা তৈরি করে এগুলো।
গ্রহাণু ও ধূমকেতু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় বরফ ও পাথরের ছোট ছোট টুকরা ছড়িয়ে দেয়। এসব বস্তু থেকে মহাকাশে ধ্বংসাবশেষের রেখা তৈরি হয়। পৃথিবী যখন ওই রেখার মধ্য দিয়ে যায়, তখন ধ্বংসাবশেষের টুকরাগুলো বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যায়। এ সময় আকাশে আলোর ঝলক দেখা যায়, যা উল্কাবৃষ্টি নামে পরিচিত।
বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যাওয়া বরফ ও পাথরের বেশির ভাগ টুকরা ধুলিকণা বা ছোট নুড়ির আকারের হয়। তবে অগ্নিগোলক তৈরি হয় মার্বেলের মতো ছোট বস্তু থেকে শুরু করে ছোট পাথরের আকারের ধ্বংসাবশেষের কারণে।
এসব অগ্নিগোলক শুক্র গ্রহের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হতে পারে। কোনো কোনোটি আকাশে আয়নিত বায়ুকণার উজ্জ্বল রেখা তৈরি করে, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে যায়। আবার কিছু অগ্নিগোলক থেকে মেঘের মতো ধোঁয়ার রেখা তৈরি হয়, যা কয়েক মিনিট পর্যন্ত আকাশে দৃশ্যমান থাকতে পারে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক বেথানি কব কুং বলেন, অগ্নিগোলক দেখা সত্যিই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হতে পারে। কারণ, এ ধরনের দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না।
দক্ষিণ টরিড উল্কাবৃষ্টি প্রতিবছর ঘটে। এতে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে প্রায় পাঁচটি উল্কা দেখা যায়। দক্ষিণ মেরু ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব জায়গা থেকেই এ উল্কাবৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
যেভাবে উল্কাবৃষ্টি দেখবেন: এবার আকাশে চাঁদের সরু অংশ বা বাঁকা চাঁদ দেখা যাওয়ার কথা। ফলে উল্কা দেখতে তুলনামূলক সুবিধা হতে পারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী বেথানি কব কুংয়ের পরামর্শ, প্রথমে অরায়ন নক্ষত্রমণ্ডল খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষ করে এর বেল্ট বা তিনটি তারার সারি শনাক্ত করতে হবে।
কুং বলেন, অরায়ন খুঁজে পেলে ডান দিকে তাকালেই বৃষ নক্ষত্রমণ্ডল পাওয়া যাবে। তবে আকাশের ঠিক নির্দিষ্ট কোনো অংশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। মোটামুটি ওই দিক বরাবর তাকালেই উল্কা দেখা যেতে পারে।
উল্কাবৃষ্টি ভালোভাবে দেখতে শহরের আলো থেকে দূরে অন্ধকার কোনো জায়গা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নাসার কর্মকর্তা বিল কুক। তার মতে, অন্ধকারে অন্তত ৩০ মিনিট থাকতে হবে, যাতে চোখ অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। এ সময় মোবাইল ফোনের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
কুক বলেন, ‘শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে দৃশ্যটি উপভোগ করুন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে সহজ অভিজ্ঞতা এটি। এর জন্য শুধু নিজের চোখই যথেষ্ট।’
একই সময়ে চলছে দুই টরিড উল্কাবৃষ্টি: দক্ষিণ টরিড উল্কাবৃষ্টি শুরু হয়েছে সেপ্টেম্বরে। এটি ২০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। অন্যদিকে, উত্তর টরিড নামে আলাদা আরেকটি উল্কাবৃষ্টি শুরু হয়েছে অক্টোবরের মাঝামাঝি। এটি ১২ নভেম্বর সর্বোচ্চ সক্রিয়তায় পৌঁছাবে এবং ১০ ডিসেম্বর শেষ হবে। উভয় উল্কাবৃষ্টির ধ্বংসাবশেষের রেখা মহাকাশে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
দক্ষিণ টরিড উল্কাবৃষ্টির সৃষ্টি হয়েছে ২পি/এনকে নামের একটি ধূমকেতুর রেখে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ থেকে। সৌরজগতের পরিচিত ধূমকেতুগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম সময়ে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে। এর জন্য সময় লাগে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বছর।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ২০ হাজার বছর আগে এনকে ধূমকেতুটি আরও বড় একটি মহাজাগতিক বস্তুর অংশ ছিল। পরে সেটি ভেঙে যায়। এর ফলে তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষের জটিল বলয় থেকেই দক্ষিণ ও উত্তর টরিডসহ অন্তত আরও তিনটি উল্কাবৃষ্টির সৃষ্টি হয়েছে।
বিল কুকের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো উল্কাবৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া। এর মাধ্যমে মহাকাশযান ও মহাকাশচারীদের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করা হয়।
কুক বলেন, এ বছর উল্কার সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ২০৩২ সালে পৃথিবী টরিড উল্কার আরও ঘন একটি ধ্বংসাবশেষের বলয়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ২০৩২ সালের হ্যালোউইনের রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকলে মাথার ওপর দিয়ে অসংখ্য উজ্জ্বল অগ্নিগোলক ছুটে যেতে দেখা যেতে পারে। বলা যায়, বড় ঝড় আসার আগে আমরা এখন কিছুটা শান্ত সময়ের মধ্যে রয়েছি। সূত্র: সিএনএন