বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র মোংলা সমুদ্র বন্দরকে ঘিরে আবর্তিত হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন।

বন্দরটির আধুনিকায়ন, ধারণক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি এবং এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত,স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক হাব’ গড়ে তোলার দায়িত্ব হাতে নিয়েছেন বর্তমান সরকার।

অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়নে মালিক, শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ সকল অংশীজনকে একযোগে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

আজ শুক্রবার ০৬ নভেম্বর দুপুরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মচারী সংঘের নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা তুলে ধরেন সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, এমপি। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বন্দরের ৯ নম্বর জেটি প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর পরিবেশে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, মোংলা বন্দর শুধু খুলনা বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্পদ নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করার অন্যতম প্রধান শক্তি।

সরকার এই বন্দরকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক ও ব্যস্ততম অর্থনৈতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করতে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এই প্রকল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করে মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দু-দুবার মোংলা বন্দর পরিদর্শন করেছেন এবং সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছেন।

মন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন। বর্তমান সরকারের এই মেয়াদের মধ্যেই মোংলা বন্দর কেন্দ্রিক বাণিজ্য, নৌ-যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক অবকাঠামোতে ব্যাপক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ভারী ও মাঝারি শিল্পায়ন এবং নতুন নতুন রপ্তানিমুখী খাতের উন্মোচন হবে, যা দেশের জিডিপিতে অসামান্য অবদান রাখবে।

শিল্প উৎপাদন ও বন্দর পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে মালিক-শ্রমিকের সুসম্পর্ককে চিহ্নিত করে মন্ত্রী বলেন, কোনো বন্দরের সক্ষমতা কেবল আধুনিক যন্ত্রপাতি বা বড় অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না, আসল শক্তি হলো মালিক ও শ্রমিকের পারস্পরিক সমন্বয়।

শ্রমিক এবং মালিক একে অপরের পরিপূরক। শ্রমিকদের ঘাম ও পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করেই জাতীয় প্রবৃদ্ধির চাকা ঘোরে। তাই দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও মোংলা বন্দরের স্বার্থে আমাদের ক্ষুদ্র মানসিকতা ও সাময়িক মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহবান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, সরকার শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ সময় তিনি কর্মচারী সংঘ ও সিবিএ (সিবিএ) নেতৃবৃন্দকে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী গঠনে আরও দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, মোংলা বন্দরের গতিশীলতা ধরে রাখতে কর্মচারী ও শ্রমিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

তাদের ন্যায্য অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সর্বদা সুদৃঢ় পদক্ষেপে কাজ করছে। নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটি বন্দর ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকদের মধ্যে একটি টেকসই সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করবে এবং মোংলা বন্দরকে সাফল্যের শীর্ষ শিখরে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শফিকুল আলম (মনা)। অনুষ্ঠানে স্বাগত ও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার মো: সোহাগ এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান, সাবেক মেয়র ও মোংলা পৌর বিএনপির সভাপতি মো: জুলফিকার আলী।

সকাল সাড়ে ১১টায় মূল অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বে প্রধান অতিথিকে ফুলের তোড়া ও লাল গালিচা সংবর্ধনায় বরণ করে নেন বন্দর চেয়ারম্যান, কর্মকর্তা কর্মচারী, বন্দর ব্যাবহারকারী ব্যবসায়ী ও সিবিএর নব নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির নেতৃবৃন্দরা। পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

পরবর্তীতে নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির সকল সদস্যকে শপথবাক্য পাঠ করান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) শেখ মামুনুর রহমান। শপথ অনুষ্ঠান শেষে প্রতিনিধিদের পরিচিতি পর্ব সম্পন্ন হয় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নব নির্বাচিত সভাপতি মো: সরোয়ার হোসেন খোকন, সাধারন সম্পাদক সোবাহান সহ কমিটির সকল সদস্যদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।

আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজ বন্দর (Green Port) গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা যৌথভাবে জেটির প্রধান প্রবেশদ্বারের সংলগ্ন প্রাঙ্গণে দুটি ফলজ ও ওষুধি গাছের চারা রোপণ করেন।

সবশেষে, বিশ্ব শান্তি, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, মোংলা বন্দরের সমৃদ্ধি এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করে এক বিশেষ দোআ ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সফল সমাপ্তি ঘটে।

উক্ত জমকালো আয়োজনে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, আমদানি-রপ্তানিকারক প্রতিনিধি, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।