নেতানিয়াহু না আইজেনকোট

ইসরায়েলে ক্ষমতার লড়াইয়ে ঝুলছে সমীকরণ

জিনিউজবিডি২৪ ডেস্ক ঃ
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
ইসরায়েলে ক্ষমতার লড়াইয়ে ঝুলছে সমীকরণ

ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলে আভাস পাওয়া গেছে। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক দরকষাকষির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ৫১টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটও ৫১টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দেশটির প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এই বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করে।

ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। ফলে কোনো জোটই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠন নিয়ে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে আলোচনা ও রাজনৈতিক সমঝোতা চলতে পারে।

এদিকে, দুই জোটের বাইরে থাকা আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ১৮টি আসন পেতে পারে বলে বুথফেরত জরিপে আভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করতে পারলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই দলগুলো।

বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর আইজেনকোট বলেন, এই ফল নেতানিয়াহুর প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইসরায়েলের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন, নেতানিয়াহুর জোট বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ ধস। জনগণ তাদের ঘরে ফিরে যেতে বলেছে।’

তবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সদস্য ও ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার বিরোধীদের আগাম বিজয় উদ্‌যাপনকে অপরিণত বলে মন্তব্য করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলে লিকুদই সবচেয়ে বড় দল। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া সব সময়ই ভালো।’

লিকুদ পার্টির নেতা নেতানিয়াহু গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রায় ১৯ বছর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও একাধিকবার ক্ষমতায় টিকে থাকার নজির রয়েছে তার।

ইসরায়েলবিষয়ক ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক এহাব জাবারিন আল জাজিরাকে বলেন, প্রাথমিক বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের শক্তি স্পষ্টভাবে কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে এর ভিত্তিতে নেতানিয়াহুর বিজয় নিশ্চিত হয়েছে কিংবা তার রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটেছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

এহাব জাবারিন বলেন, জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। কিন্তু তার বিরোধীদের জন্যও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা কঠিন হবে। কোনো পক্ষই সরকার গঠন করতে না পারলে আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন।

সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেবেন প্রেসিডেন্ট?

এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

আগামী ৪ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করবেন, তাকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন।

তবে পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতাকেই যে এই দায়িত্ব দেওয়া হবে, বিষয়টি এমন নয়।

লিকুদ পার্টি ও আইজেনকোটের দল তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় তাদের দুজনকেই সরকার গঠনের প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সরকার গঠনের জন্য কত দিন সময় পাওয়া যাবে?

সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া প্রার্থী প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পাওয়া যেতে পারে।

এই সময়ে দলগুলোর মধ্যে নিবিড় আলোচনা ও দরকষাকষি চলবে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন দল নীতিগত ছাড়, মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে সমঝোতা করতে পারে।

কোনো প্রার্থী ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে ছোট দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। এছাড়া পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যবস্থাসহ ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তিও হতে পারে।

নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিতে হলে পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন পেতে হবে। কোনো কোনো সদস্য ভোটদানে বিরত থাকলে ৬১টির কম ভোট পেয়েও সরকার আস্থা ভোটে জয়ী হতে পারে।

আলোচনা ব্যর্থ হলে কী হবে?

প্রথম প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট নেসেটের অন্য কোনো সদস্যকে দায়িত্ব দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রার্থী ২৮ দিনের মধ্যে সরকার গঠনের চেষ্টা করবেন।

তিনিও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় একজন প্রার্থীকে মনোনীত করতে পারবেন। ওই প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য চূড়ান্তভাবে ১৪ দিন সময় পাবেন।

এরপরও অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব না হলে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসরায়েলিদের আবারও নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।

নতুন নির্বাচন ৯০ দিনের মধ্যে আয়োজন করতে হবে। এর মধ্যবর্তী সময়ে নেতানিয়াহুর সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।

এর আগেও কি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?

হ্যাঁ। ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থার নজির রয়েছে।

২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশটিতে তিন দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ও তাঁর তৎকালীন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্তজের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, তাঁদের পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের কথা ছিল।

তবে বাজেট পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় এক বছরের মধ্যেই সেই সরকার ভেঙে পড়ে।

আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে কি জোট গড়বে বিরোধীরা?

বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট-দুজনই এসব দলের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তাদের যুক্তি, এসব দলের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক মূল্যবোধের মিল নেই।

ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসাফ রোনেল বলেন, বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর ‘দুঃস্বপ্নের সরকারের’ অবসানের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বিরোধী নেতারা আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে নিজেদের অনীহা ও বৈষম্যমূলক অবস্থান কাটিয়ে উঠতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

আসাফ রোনেল বলেন, এখন প্রশ্ন হলো, তারা নির্বাচনের আগে দেওয়া বৈষম্যমূলক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে পারবেন কি না। তা না হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আবারও নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

Ads