দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের আশঙ্কায় ফের নিয়োগ বোর্ড স্থগিত

আব্দুস সবুর, তানোর প্রতিনিধি (রাজশাহী) ঃ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬, ৪:০৭ অপরাহ্ণ
দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের আশঙ্কায় ফের নিয়োগ বোর্ড স্থগিত

রাজশাহীর তানোর পৌর সদের ঐতিহ্য বাহী তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং কমিটির ভাগবাটোয়ারার দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের আশঙ্কায় আবারো নিয়োগ বোর্ড স্থগিত করা হয়েছে বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেন। আজ ২৪ মার্চ মঙ্গলবার সকাল ১০ টার দিকে নিয়োগ বোর্ড করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল।

এমনকি ডিজির প্রতিনিধিকে আনতে শহরে অবস্থান করছিলেন গভর্নিং বডির সভাপতি সেলিম উদ্দিন কবিরাজ। এছাড়াও চাকুরী প্রার্থীরা সঠিক সময়ে পরিক্ষা দিতে কলেজে উপস্থিত হন। কিন্তু সময়মত পরিক্ষা না নেয়ার জন্য তারাও কলেজে হট্টগোল ও বিক্ষোভ শুরু করেন।

এদিকে নিয়োগের আগেই কোটি টাকার বানিজ্য করা হয়েছে বলে ডিসি ও ইউএনওসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন তালন্দ গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ছাত্র দলের নেতা শিক্ষক আব্দুস সালাম। অভিযোগের ভিত্তিতে দুদফা তদন্ত হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ তদন্ত নিজের পক্ষে নিতে দুদফা মব সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষ কে ঘায়েল করেন।

এসব নিয়ে কলেজ শিক্ষক ও স্থানীয়দের মাঝে কয়েক টি গ্রুপ সৃষ্টি হয়। যার কারনে একাধিক বার নিয়োগ বোর্ডের দিন ধার্য করা হলেও স্থগিত করা হচ্ছে বারবার। ফলে নিয়োগ সিন্ডিকেট চক্রের বারবার আশা ভঙ্গ হচ্ছে। চট্রম হয়রানির শিকার হচ্ছেন চাকরি প্রার্থীরা।

স্থানীয়রা জানান, ঈদের পরে ২৪ মার্চ মঙ্গলবার নিয়োগ পরিক্ষার জন্য প্রার্থীদের চিঠি দেয়া হয়। পরিক্ষার সময় দেয়া হয় সকাল ১০ টা। সময়মত প্রার্থীরা উপস্থিত হন। কিন্তু সময় অতিবাহিত হলেও পরিক্ষা না নেয়ার কারনে প্রার্থীরা হট্টগোল ও বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভ ও হট্টগোল ও নিয়োগ কর্তৃপক্ষ উপস্থিত না হওয়ার কারনে পরিক্ষা স্থগিত মর্মে নোটিশ সাটিয়ে দেয়া হয়।

নিয়োগ পরিক্ষা সফল করতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সভাপতি থানা পুলিশ সহ ভাড়াটিয়া বাহিনী নিয়ে আসা হয়, সভাপতির নির্দেশে কয়েক গ্রাম থেকে নিয়োগ সফল করতে ভাড়াটিয়া বাহিনী আনা হয়েছিল। কিন্তু কোনকিছুতেই কাজ হল না।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শেষ দিন আজ।তবে ওই বিজ্ঞপ্তিতে অন্যত্র নিয়োগ বোর্ড করতে কলেজে দফায় দফায় মিটিং করছেন নিয়োগ সিন্ডিকেট চক্র বলেও সুত্র নিশ্চিত করেন । আতঙ ছড়িয়ে পড়ে কলেজের আশপাশের এলাকায়।

এক পক্ষ নিয়োগ পরিক্ষার জন্য জোর লবিং শুরু করেন আরেক পক্ষ নিয়োগ পরিক্ষা বন্ধের জন্য তদারকি শুরু করেন। গত কয়েকদিন ধরে নিয়োগ পরিক্ষার জন্য দফায় দফায় সভা ও মিটিং করেন সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং শিক্ষক প্রতিনিধি সহ চক্রের সদস্যরা।

সুত্র জানায়, নিয়োগের আগেই কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। যাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছে তাদেরকে চাকুরী দিতে মরিয়া নিয়োগ চক্র। কারন কলেজের বিদ্যুৎ বিল ও জমির খাজনা বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মত। এদোহায়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নেয়া হয়েছে।

কয়েকজন শিক্ষক জানান, কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হবে ওমর আলীকে। অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু ওমর কে রাজনৈতিক প্রভাবে ও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দেয়া হচ্ছে নিয়োগ।

নিয়োগের জন্য সিলেকশন করা হয়েছে গভর্নিং বডির সভাপতির স্বজনকে। সিলেকশন করা হয়েছে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের স্বজনদেরও। অথচ সভাপতি, শিক্ষক প্রতিনিধি সহ তাদের দাবি কোন টাকা লেনদেন হয়নি। তাহলে কেন প্রার্থী সিলেকশন করা হল এমন প্রশ্ন জনমনে।

জানা গেছে, গত বছর থেকে তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রি কলেজে পাঁচটি শূন্য পদে নিয়োগ দিতে সক্রিয় হয় কলেজ শিক্ষকদের একাংশ ও গভর্নিং বডি। এজন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য বাধে ব্যাপক জটিলতা। পাঁচটি শূন্য পদে নিয়োগ দিতে আগে থেকে প্রার্থী সিলেকশন করা হয়।

বিএনপি ও জামায়াতের স্বজনদের চাকুরী দিতে মরিয়া হয়ে পড়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সভাপতি সেলিম উদ্দিন কবিরাজ। অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পেতে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেন ওই কলেজের শিক্ষক ওমর আলী। তাকে ওই পদে নিয়োগের জন্য সিলেকশন করেন নিয়োগ চক্র।

শুধু তাই না নিয়োগের আগেই কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলেও সুত্র নিশ্চিত করেন এবং লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। নিয়োগ সিন্ডিকেট চক্রের কথামত কাজ না করার কারনে আগের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাবিহা সুলতানাকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়া হয়।

এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ দেয়া ও নিয়োগের আগেই কোটি টাকার লেনদেনের বিষয় উল্লেখ করে ডিসি ও ইউএনওর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন সাবেক ছাত্র দলের নেতা শিক্ষক আব্দুস সালাম।

অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাহী অফিসার ইউএনও নাঈমা খাঁন, কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ, উপজেলা প্রকৌশলী নুর নাহারকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা দায়িত্ব পেয়ে গত ফেব্রুয়ারী মাসের ২৬ তারিখে উপজেলা কৃষি অফিসে তদন্তের দিন ধার্য করেন। কিন্তু রমজান মাস ও ঈদের ছুটি ছিল কলেজ। কলেজে সরেজমিনে ও ছুটি পরে তদন্তের দাবি জানিয়ে ইউএনও বরাবর লিখিত আবেদন করেন আব্দুস সালাম।

তিনি আবেদন করে কলেজ শিক্ষক কবির হোসেন ও মুখলেস এবং সাবিহা সুলতানা চলে যেতে লাগেন। এসময় কৃষি অফিসের সামনে কবিরের উপর চড়াও হয়ে মব সৃষ্টি করেন কলেজ শিক্ষক গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি বিএনপি নেতা সাজ্জাদ সহ তার লোকজন। এমনকি কবির কে প্রাণনাশের হুমকি ধামকি প্রদান করা হয়।

এক তরফা প্রতিবেদন নিতে ঘন্টা ব্যাপী সাজ্জাদ, গভর্নিং বডির সভাপতি সেলিম উদ্দিন কবিরাজ, স্থানীয় জামাত নেতা মিজানুর সহ তারা অবস্থান করেন। কিন্তু সালামের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২ মার্চ কলেজে সরেজমিনে তদন্ত করেন কৃষি অফিসারের প্রতিনিধি ও প্রকৌশলী নুর নাহার। কলেজে তদন্তে শেষে সেখানেও মব সৃষ্টি হয় নিজেদের মধ্যে।

সালাম অভিযোগে উল্লেখ করেন, অধ্যক্ষসহ পাঁচটি শূন্য পদে নিয়োগ দিতে কোটি টাকার লেনদেন করা হয়েছে এবং প্রার্থী সিলেকশন করা হয়েছে।

পূর্বের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাবিহা সুলতানা সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী নিয়োগ দিতে চাইলে তাকে সরিয়ে জৈষ্ঠতা লঙ্ঘন করে সাবেক এমপি ফারুক চৌধুরীর সভা মঞ্চের উপস্থাপক নজরুল ইসলাম কে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন দেয়া হয় । নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হওয়ার পর গভর্নিং বডির সভাপতি সেলিম উদ্দিন কবিরাজ সহ সদস্যরা নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে পড়েন।

সেলিম উদ্দিন কবিরাজ ওই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময় পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সাক্ষরে তানোর (চাপড়া) মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হয়েছিলেন। এবারে বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের আশীর্বাদে তালন্দ কলেজের সভাপতি হন।

গভর্নিং বডির সভাপতি সেলিম উদ্দিন কবিরাজ কে একাধিক বার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

একারনে নিয়োগ স্থগিতের বিষয়ে তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নি। তবে নিয়োগ বোর্ড স্থগিতের বিষয়ে নিশ্চিত করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম জানান, নিয়োগ পরিক্ষা অনিবার্য কারনে স্থগিত করা হয়েছে।

কি কারনে স্থগিত ও প্রার্থীরা এসে পরিক্ষা না নেয়ার কারনে বিক্ষোভ বা হট্টগোল এবং সভাপতি নাকি ভাড়াটিয়া লোকজন এনেছিল জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি জরুরি মিটিং করছি বলে দায় সারেন।

Ads