গাজীপুরে গরু চুরির সঙ্গে তিনজনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আতঙ্ক, দিশেহারা গ্রামবাসী

সাগর আহম্মেদ, কালিয়াকৈর প্রতিনিধি(গাজীপুর)ঃ
প্রকাশিত: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ৩:৩৬ অপরাহ্ণ
গাজীপুরে গরু চুরির সঙ্গে তিনজনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আতঙ্ক, দিশেহারা গ্রামবাসী

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আসন্ন কোরবানী ঈদ উপলক্ষে আগে ছিল শুধুই গরু চুরি যাওয়ার আতঙ্ক। তার সঙ্গে গরু চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে তিনজনকে হত্যা মামলায় নতুন করে যুক্ত হলো গ্রেপ্তার আতঙ্ক। এখন গরু চুরি ঠেকাতে রাত জেগে পাহাড়া দিবেন নাকি গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে থাকবেন? এমনটি ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ। তবে এ মামলায় গ্রেপ্তার ও হয়রানি না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন গ্রামবাসী।

নিহতরা হলেন- ঢাকার মিরপুর থানার মধ্যপিরেরবাগ এলাকার আব্দুল বারেকের ছেলে সেলিম হোসেন (৩৮), গাজীপুরের শ্রীপুর থানার নিজমাওনা এলাকার সরাফত আলীর ছেলে আজাহারুল ইসলাম (৩৫) ও সিলেট সদর থানার ঘাসিটোলার এলাকার কমল কান্তের ছেলে কৃষ্ণ কান্ত (৪৬)।

সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে এলাকাবাসী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গরু চোরচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা নিয়মিত খামার ও বাড়ি বাড়ি থেকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছেন। চোরচক্রের হানায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন পশু খামারীসহ অসহায় কৃষক পরিবার।

চোরচক্রের হানায় অতিষ্ঠ হয়ে গরু চুরি রোধে বিভিন্ন এলাকায় রাঁত জেগে পালা করে পাহাড়া দিচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষ। তারপরেও শনিবার দিবাগত গভীর রাতে ১০ থেকে ১২ সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ গরু চোর চক্র একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ে কালিয়াকৈর উপজেলার ইউনিয়নের বাগচালা এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের বাড়িতে যায়। এ সময় বাড়ির মালিক বিষয়টি টের পেয়ে আশপাশের লোকজনকে ডাক দিলে স্থানীয়রা তাদের ধাওয়া করেন। আর ধাওয়া খেয়ে চোরচক্র পিকআপ ভ্যান যোগে পালিয়ে যাওয়া চেষ্টা করলে রাস্তায় গতি রোধ করেন এলাকাবাসী।

একপর্যায়ে তারা রবিবার ভোর ৪টার দিকে রাস্তায় গাছ ফেলে দুই চোরকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। চোরচক্রের বাকী সদস্যরা দৌড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এসময় তারা ওই পিকঅ্যাপ ভ্যান থেকে তালা কাটার সরঞ্জাম, চাপাতি ও দাস উদ্ধার করেন। পরে বিক্ষুব্দ এলাকাবাসী চোরচক্রে ব্যবহৃত পিকআপ ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করে। খবর পেয়ে মাওনা ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ততক্ষণে আগুনে ওই পিকঅ্যাপ ভ্যানটির অধিকাংশ পুড়ে যায়।

অপরদিকে পাশের তালচালা এলাকা থেকে এক গরু চোরকে আটক করে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী। খবর পেয়ে কালিয়াকৈর থানা ও ফুলবাড়িয়া ক্যাম্পের পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে গুরুত্ব আহতাবস্থায় তিনজনকে উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সেলিম হোসেন, আজাহারুল ইসলাম ও কৃষ্ণ বর্মণ নামে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে ময়নাতদন্তের জন্য নিহতের লাশ ওই হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

অথচ এ ঘটনায় ওইদিন রাতে কালিয়াকৈর থানাধীন ফুলবাড়ীয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাত ২০০ জনের নামে মামলা দায়ের করেন। পরের দিন সোমবার সকালে ওই মামলার বিষয়টি জানাজানি হলে গরু চুরি আতঙ্কের সঙ্গে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে তিনজনকে হত্যা মামলায় শুরু নতুন করে যুক্ত হলো গ্রেপ্তার আতঙ্ক। এখন গরু চুরি ঠেকাতে রাত জেগে পাহাড়া দিবেন নাকি গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে থাকবেন? এমনটি ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ। তবে ওই চোর চক্রের সদস্যরা মৃত্যুর আগে জানিয়েছেন, স্থানীয় কয়েকজন তাদের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। তবে তাদের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় গরু চোরদের গ্রেপ্তারের দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয় ফুলবাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক জুয়েল সরকার জানান, গণপিটুনিতে যারা মারা গেছেন, তারা গরু চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদের নামে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। কিন্তু পুলিশ বাদী হয়ে চোর সন্দেহে যে মামলা দায়ের করেছে, এ মামলায় যেন গ্রামবাসীকে হয়রানি না করা হয়। এরা চোর তো না এরা যেন অস্ত্র-স্বস্ত্র নিয়ে ডাকাতি করে। উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য সাব্বির আহম্মেদ কছিম জানান, শুনেছি যারা গণপিটুনিতে মারা গেছেন, তারা আসলেই চুরি করতেন।

তারা আন্তর্জাতিক চোরচক্রের সদস্য, এরা মাদকাসক্তও। কিন্তু দায়েরকৃত মামলায় সন্দেহবাজক কথা বলে আমাদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সন্দেহ নয় এরা অস্ত্র নিয়ে ধরা পড়েছে, এরা চোর। সাধারন মানুষ এ মামলায় যেন কোনো ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, এটা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি। শুধু তারা দুজনই নয়, স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, এখন গরু চুরি ঠেকাতে রাত জেগে পাহাড়া দিবেন নাকি গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে থাকবেন? এমনটি ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ। তবে এ মামলায় গ্রেপ্তার ও হয়রানি না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন গ্রামবাসী।

এব্যাপারে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, নিহতদের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়াও আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। ওই তিনজনকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় কালিয়াকৈর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়াও হত্যাকান্ডে জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জনগণকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

Ads