ধ্বংসের শেষ প্রান্তে সৈয়দপুরের টেলিগ্রাম অফিস

মোঃ জহুরুল ইসলাম খোকন, সৈয়দপুর প্রতিনিধি(নীলফামারী)ঃ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫২ অপরাহ্ণ
ধ্বংসের শেষ প্রান্তে সৈয়দপুরের টেলিগ্রাম অফিস

১৮৭০ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওেয়ের বিশাল কারখানা গড়ে উঠে সৈয়দপুরে। ওই সময় সৈয়দপুরে টেলিগ্রাম অফিসটিও নির্মাণ করা হয়। তখনকার আধুনিকায়নের ইতিহাস ওই টেলিগ্রাম অফিসে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের রেলপথের সাথে। আর সেই গৌরবময় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী দেড় শতাব্দীর পুরোনো ঐতিহাসিক টেলিগ্রাফ অফিস ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনটি। কিন্তু বর্তমানে তদারকি ও সংস্কারের অভাবে বিটিসিএলের মালিকানাধীন প্রাচীন যোগাযোগ স্থাপনাটি ধ্বংসের শেষ প্রান্তে।

​স্থানীয়দের মতে, কোনো প্রকার তদারকি না থাকায় মূল্যবান ওই ভূসম্পত্তিটি প্রভাবশালীরা যেকোনো সময় দখল করে নিতে পারে। ভবনটিকে সরকারি উদ্যোগে সংস্কার করে টেলিযোগাযোগ প্রদর্শনী কেন্দ্র বা তথ্যচিত্র জাদুঘরে রূপান্তর করা হলে একদিকে যেমন ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা পাবে। অন্যদিকে ভ্রমণপ্রেমী আর ইতিহাসপ্রিয় মানুষদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবে। এতে নতুন প্রজন্ম যোগাযোগের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে, পাশাপাশি বাড়বে এলাকায় পর্যটক আগমনের সম্ভাবনা।

​বিটিসিএল সূত্র জানায়, ১৮৭০ সালে রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে।তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের শিয়ালদহ-শিলিগুড়ি ব্রডগেজ লাইনের প্রধান জংশন ছিল সৈয়দপুর। এই ব্রডগেজ লাইনের ট্রেন চলাচল ও সিগন্যালের বার্তা দ্রুত আদান-প্রদানের জন্য স্টেশনের পাশেই প্রায় এক একর ১০ শতক জমির ওপর এই অফিসটি স্থাপন করা হয়।

চুন-সুরকি, পোড়ামাটির লাল ইট এবং ভারী লোহার বিম দিয়ে এটি নির্মাণ করে ব্রিটিশ গণপূর্ত বিভাগ। খিলান আকৃতির দরজা-জানালা আজও ভবনটির প্রাচীন ঐতিহ্যের জানান দেয়। এর ভেতরে কাজের সুবিধার্থে বেশ কয়েকটি সুপরিসর কক্ষ নির্মাণ করা হয় । ভবনের মাঝখানের বিশাল হলরুমটি ছিল টেলিগ্রাফের মরস কোড রিসিভার। এছাড়া রয়েছে স্টাফ কোয়ার্টার ও প্রাচীন টেলিকম টাওয়ার।

​বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এটি উত্তরবঙ্গ ও আসাম অঞ্চলের প্রধান ম্যানুয়াল টেলিফোন এক্সচেঞ্জে রূপান্তরিত হয়। তখন ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই অফিসটি ছিল একমাত্র ভরসা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আসাম সীমান্তে জাপানি সেনাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের রসদ সরবরাহের জরুরি ‘তারের খবর’ পাঠাতে এই অফিসটি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা হতো।

​স্বাধীনতার পর এটি পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ এবং টেলিফোন বিভাগ, টিএন্ডটি বোর্ড, বিটিটিবি এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালে বিটিসিএল-এর অধীনে আসে। নব্বইয়ের দশকে এখানে আধুনিক ডিজিটাল সুইচিং ও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে রংপুর রোডে বিটিসিএলের নতুন অফিস স্থানান্তরিত হওয়ায় এই ঐতিহাসিক ভবনটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

​গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটি এখন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। এর দেওয়ালে বট-অশ্বত্থ গাছ গজিয়েছে, দরজা-জানালা খুলে পড়ছে এবং খসে পড়েছে পলেস্তারা। মূল ভবনের পাশের কোয়ার্টারগুলোতে অজ্ঞাত লোকজন অবৈধভাবে দখলে নিয়ে বসবাস করছে।

মোখলেস হোসেন নামের এক স্হানীয় বাসিন্দা বলেন, চারপাশের মূল্যবান জমি দখলের মুখে পড়ছে। রাতের আঁধারে ভবনের ভেতরের পুরোনো লোহালক্কড় ও দামি ইট চুরি হয়ে যাচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ দ্রুত এগিয়ে না এলে এই ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।

​সৈয়দপুর সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক কামরুল হাসান সিদ্দিকী বলেন,অফিসটি কেবল একটি সাধারণ ভবন নয়। এটি এ অঞ্চলের যোগাযোগের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন প্রজন্ম সৈয়দপুরের গৌরবময় অতীত সম্পর্কে জানতে পারবে না। তিনি অবিলম্বে এটি সংস্কার করে টেলিযোগাযোগ প্রদর্শনী কেন্দ্র বা তথ্যচিত্র জাদুঘরে রূপান্তর করার পরমর্শ দেন।

এবিষয়ে কথা হয়, বিটিসিএল এর নীলফামারী কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্হাপক রেজাউল হকের সাথে, তিনি বলেন, মুল ভবনটি অত্যন্ত পুরাতন। যেকোনো সময় সেটি ধ্বসে পড়ার আশংকা রয়েছে। এজন্য সেটি ব্যবহার না করে সৈয়দপুর শহরের রংপুর রোড় সংলগ্ন নতুন অফিস থেকে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

​এ বিষয়ে নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

Ads