শিক্ষকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ যৌথ বিবৃতি

জিনিউজবিডি২৪ ডেস্ক ঃ
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ যৌথ বিবৃতি

প্রতিকি ছবি ঃ

সম্প্রতি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়— জুলাই আন্দোলন বিতর্কিত করা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকার বিরোধী অপপ্রচার, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্কের অভিযোগে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত করা, প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং সত্যানুসন্ধানের নামে বিধিবহির্ভূত তদন্ত পরিচালিত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সাদেকা হালিম, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোঃ শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক আফরোজা শেলীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলোজি বিভাগের অধ্যাপক মোঃ আবদুল মুহিতকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অপসারণসহ একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফ এবং শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মোঃ রফিকুল ইসলামকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২৮ জুলাই উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সভায় এসকল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন এবং জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি’র অধ্যাপক রিসালা খানের বিরুদ্ধেও জুলাই আন্দোলনকে বিতর্কিত করার অভিযোগে স্ব-স্ব বিশ্ববিদ্যালয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে মর্মেও গুঞ্জন রয়েছে। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের শাস্তি ও হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে।

আমরা মনে করি, এ ধরনের পদক্ষেপ, ভিন্নমত দমন এবং চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ধারাকে ধ্বংস করার চেষ্টা। একই সঙ্গে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে ঢালাও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি। এমতাবস্থায় অগণতান্ত্রিক ও আক্রমণাত্মক নীতি পরিহার এবং শিক্ষকদের চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে, উন্নত রাজনৈতিক সমাজ বিনির্মাণে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

অভিযোগ উঠেছে, আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে, কতিপয় শিক্ষক সমকালীন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠেছেন, যার ফলে তারা নিজেরা এবং তাদের প্রকাশ্য ও গোপন গ্রুপগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবহির্ভূত, অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক কর্মকাণ্ডের বৈধতা উৎপাদনে প্রকাশ্য ও গোপনে সক্রিয় রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চিহ্নিত রাজনৈতিক শক্তির প্রচ্ছন্ন সহায়তা ও সমর্থনে এই সকল শিক্ষক—গ্রুপ, তাদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও মতাদর্শিক বিরোধকে পুঁজি করে ভিন্নমত দমনে কাজ করছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাস্তবতাকে সঙ্কটে ফেলছে।

লক্ষ্য করা গেছে, এ সকল শিক্ষক—গ্রুপ যখন যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে তখনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো প্রকার আইনের তোয়াক্কা না করেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যা স্বেচ্ছাচারিতার উৎকট প্রকাশ। ফলে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির চর্চা হুমকির মুখে পড়েছে, যার অবসান হওয়া জরুরি।

এ সকল শিক্ষক—গ্রুপগুলো মতাদর্শিক বিরোধ, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, প্রশাসনিক ও সরকারি আনুকূল্য লাভে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে সচেষ্ট রয়েছে। এদের গুপ্ত শাখা ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষক ফোরাম, গত ২৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা উপাচার্য বরাবরে প্রদান করলে, পরের দিনেই অভিযোগটি সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপিত হয়। পরবর্তীতে এই তালিকাটি ১২৫ জনে নেমে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, এই তালিকা সংকোচনে একটি আর্থিক লেনদেন বড় ভূমিকা রেখেছে। সর্বশেষ তারা ৩১ জনের আরও একটি নতুন তালিকা প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনের তোয়াক্কা না করেই এই সকল তালিকায় নাম থাকা শিক্ষকদের তলব করে চিঠি পাঠিয়েছে, যাদের মধ্যে ড. কাবেরী গায়েন অন্যতম। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক মনোভাব ও অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই।

৫ আগস্ট পরবর্তী সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানাভাবে শিক্ষক হয়রানি ও নির্যাতন, জোরপূর্বক পদত্যাগ ও চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি ও তাদের নামে পদত্যাগপত্র লিখে জমা দেওয়াসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেছে। জানা গেছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অজুহাতে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সকল ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কিংবা সরকার তরফে কোনো প্রকার তৎপরতা না থাকায় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশের বিপরীতে প্রতিশোধপ্রবণ রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের চর্চা বিকশিত হচ্ছে, যা সমাজ-জাতি-রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।

আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা নির্দিষ্ট মতাদর্শগত শুদ্ধি অভিযানের ক্ষেত্র নয়। ভিন্নমত দমন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচনের বিদ্যমান সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বাধীন চিন্তা ও সংস্কৃতিচর্চা, একাডেমিক স্বাধীনতা ও জ্ঞান সৃষ্টির মূলকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন:

১। আকরামুল হক, সংগঠক, ঢাকা
২। দস্তগীর জাহাঙ্গীর, সম্পাদক, দ্য ভয়েস, যুক্তরাষ্ট্র
৩। পারভেজ হাসেম, আইনজীবী (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট) ও মানবাধিকারকর্মী, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র
৪। জীবনানন্দ জয়ন্ত, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
৫। ভায়লেট হালদার , সম্পাদক, সময়ের শব্দ, নরওয়ে
৬। আল আযম খান, মানবাধিকারকর্মী, ঢাকা
৭। উম্মে হাবিবা, ব্যারিস্টার অ্যান্ড সলিসিটর, কানাডা
৮। ইউসুফ চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা, ইঞ্জিনিয়ার, বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র
৯। সোহানা আহমেদ, কো-অর্ডিনেটর, সাংগাত বাংলাদেশ
১০। জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা, সাংস্কৃতিক সংগঠক, মেলবর্ণ, অস্ট্রেলিয়া
১১ । মিরাজ আহমেদ, সমাজকর্মী, ঢাকা
১২ । মোঃ সাদিক হাসান, উপদেষ্টা, হউকেল্যান্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল, বার্গেন, নরওয়ে
১৩ । সিরাজুম মনিরা, ডক্টরাল রিসার্চার, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ডিভিশন, ওয়ারস বিশ্ববিদ্যালয় অফ টেকনোলজি, পোল্যান্ড
১৪। মনিরুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী, টরন্টো, কানাডা
১৫। মজিবুল হক মনি, শিক্ষক, লন্ডন, যুক্তরাজ্য
১৬। এ কে আজাদ, সাংস্কৃতিক ও সমাজকর্মী, বাংলাদেশ
১৭। সোহেলা পারভীন, চিত্রশিল্পী, ফ্রান্স
১৮। ইশতিয়াক জামিল, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়, নরওয়ে
১৯ । তুহিন দাস, কবি, পেনসালভানিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
২০ । মো. ইফতেখার সাদিক, হিসাবরক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক, মেলবর্ণ, অস্ট্রেলিয়া
২১। মনিরা রহমান, টিডিএসবি অফিস অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও সাংস্কৃতিক কর্মী, অন্টারিও, কানাডা
২২। লিয়াকত হোসাইন লিমন, লেখক, ব্লগার, মানবাধিকারকর্মী, সুইডেন
২৩। তুষার গায়েন, কবি, প্রাবন্ধিক, টরন্টো, কানাডা
২৪। আমিনুর রহমান, গবেষক, হউকেল্যান্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল, নরওয়ে
২৫। শ্যামলী নীলা, ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার, সুইজারল্যান্ড
২৬। জয়দেব চন্দ্র শীল, ব্লগার, মানবাধিকারকর্মী
২৭। সামিয়া মহসীন, কলামিস্ট, ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র
২৮। ফয়েজ খান তৌহিদ, মানবাধিকারকর্মী, যুক্তরাজ্য
২৯। রেজিনা সুলতানা, বিভাগীয় প্রধান ও চেয়ারপারসন , ইংরেজি বিভাগ, ক‍ানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
৩০। অপূর্ব দাস, কলামিস্ট ও লেখক, ঢাকা, বাংলাদেশ।

Ads