অতিরিক্ত ক্লাস’-এর নামে প্রকাশ্যে বাণিজ্য:

বিরামপুরের শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষা বাণিজ্যের ভয়াবহ নৈরাজ্য!

মিজানুর রহমান মিজান, বিরামপুর প্রতিনিধি (দিনাজপুর) ঃ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০১ অপরাহ্ণ
বিরামপুরের শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষা বাণিজ্যের ভয়াবহ নৈরাজ্য!

নিয়ম-নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে চলছে ‘অতিরিক্ত ক্লাস’-এর নামে ভয়ঙ্কর কোচিং বাণিজ্য ও শিক্ষার্থী জিম্মিকরণ। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকেই বাণিজ্যিক আখড়ায় পরিণত করে সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আটকে রেখে মাসে আদায় করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা! শিক্ষার আলো ছড়ানোর কথা যে প্রতিষ্ঠানে, সেখানে এখন প্রকাশ্যে চলছে অর্থলুট আর শিক্ষার্থী নিপীড়নের উৎসব।

‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ অনুযায়ী যেখানে উপজেলা পর্যায়ে প্রতি বিষয়ে সর্বোচ্চ ফি ১৫০ টাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রসিদ বাধ্যতামূলক। সেখানে কোন ক্ষমতাবলে মাসে ৩ হাজার টাকা পকেটস্থ করা হচ্ছে, তার কোনো সদুত্তর নেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রধান শিক্ষক আদায়ের কথা স্বীকার করে অদ্ভুত অজুহাত দিলেও সাংবাদিকদের প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে উঠেন। এতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই অনৈতিক সিন্ডিকেটের আসল চেহারা।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে মূল পাঠদান বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে কোচিংয়ে মনোযোগ দিচ্ছেন। আর যেসব শিক্ষার্থী এই চড়া মূল্যের অর্থ দিতে পারছে না, তাদের সহ্য করতে হচ্ছে চরম মানসিক নির্যাতন ও শ্রেণিকক্ষে বৈষম্য। এমনকি স্কুলের এই বাণিজ্য-ফাঁদে পা না দিয়ে বাইরে পড়ার ‘অপরাধে’ শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের হাতে হেনস্তার শিকার পর্যন্ত হতে হয়েছে। যা শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে কালিমালিপ্ত করেছে।

এত টাকা আর দীর্ঘ সময়ের তথাকথিত ‘স্পেশাল কোচিং’-এর আসল চিত্র উঠে এসেছে পরীক্ষার ফলাফলে। ২০২৫ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৭৬ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে ধসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০.৬১ শতাংশে! এই শোচনীয় ধস প্রমাণ করে, শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে অভিভাবকদের পকেট খালি করাই এই চক্রের মূল লক্ষ্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, স্কুলে অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য প্রতি মাসে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো বোঝানোর পরিবর্তে হুবহু মুখস্থ করানোর অভিযোগ উঠেছে। বায়োলজিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও মুখস্থনির্ভর পদ্ধতিতে পড়ানো হয় বলে ওই শিক্ষার্থী জানায়। প্রায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বাধ্যতামূলক বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই কোচিং ক্লাসে অংশ নেয়। এতে অন্তত ৫০-৬০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। এভাবে মুখস্থনির্ভর কোচিং করানোর কোনো অর্থ হয় না এবং শিক্ষার্থীদের এসব কোচিং না করাই উচিত।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে আরেক শিক্ষার্থী জানান, স্কুলে অতিরিক্ত ক্লাস বা কোচিংয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে ফি প্রদান করতে হয়। একেকটি ব্যাচে ৪০ জন ছাত্রসহ সব মিলিয়ে আনুমানিক ৭০ জনের মতো শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। ক্লাসের পড়াশোনার মান সন্তোষজনক না হওয়ায় সেই শিক্ষার্থী নিজে মাত্র এক মাস ক্লাস করার পর পড়া ছেড়ে দেয়। কোনো নতুন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর পূর্বে অন্তত এক মাস ক্লাস করিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেয় উক্ত শিক্ষার্থী।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমিনুর রহমান, শাহজাহান আলী, শ্রী সুশান্ত, ওমর ফারুক ও দেলোয়ার হোসেন এ অতিরিক্ত ক্লাস/কোচিং কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহাজান আলী জানান, স্কুলে অতিরিক্ত পাঠদানের মূল সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের। পরিপত্রের আলোকেই শিক্ষকগণ নির্ধারিত ডিউটি পালন করছেন। ৩ হাজার টাকা ফি আদায়ের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে জানান, শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে নির্ধারিত ১,৮০০ টাকা (বা প্রতি বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিপত্র অনুযায়ী) ফি নেওয়া হয়। অভিভাবকদের আবেদনের প্রেক্ষিতেই রশিদ মূলে এ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এক শিক্ষার্থীর সাথে দুর্ব্যবহার এবং কোচিং না করার কারণে ক্ষোভ প্রকাশের অভিযোগটি তিনি মিথ্যা বলে দাবি করেন।

তিনি জানান, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীর সাথে একটি ভিন্ন বিষয়ে মৃদু বাকবিতণ্ডা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পারিবারিক উপস্থিতিতে আপস-মীমাংসা হয়েছে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, পরিপত্র অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কোচিং/অতিরিক্ত ক্লাস করানো হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সব শিক্ষার্থী মাসে ৩ হাজার টাকা দেয় না; কিছু শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়। মাসে ৩ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১২ দিনকে এক মাস হিসেবে না ধরে ৩০ দিন পড়ানো হচ্ছে বলেই এভাবে হিসাব করা হচ্ছে।

পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে তিনি নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি এবং শতভাগ মেধা যাচাইয়ের কথা উল্লেখ করেন। অতিরিক্ত ক্লাসের কারণে ফল খারাপ হয়নি বলেও জানান তিনি। সবশেষে তিনি জানান, তাঁরা বিদ্যালয়ের সাধারণ কর্মচারী ও শিক্ষক হিসেবে কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র।

বিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার আব্দুস সালাম বলেন, শিক্ষকরা অতিরিক্ত ক্লাস করাতে পারবেন। তবে নীতিমালা অনুযায়ী। নীতিমালায় অতিরিক্ত ক্লাস করার জন্য নির্ধারিত ফি আছে।

এ বিষয়ে বিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মিরাজুল ইসলাম এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নীতিমালাটি অনেক পুরাতন নীতিমালা দেখে এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Ads