ভূমি অফিসের নাকের ডগায় হাট-বাজারের সরকারী জমি লক্ষ লক্ষ টাকায় ক্রয়-বিক্রয়

সাগর আহম্মেদ, কালিয়াকৈর প্রতিনিধি(গাজীপুর)ঃ
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৩৩ অপরাহ্ণ
ভূমি অফিসের নাকের ডগায় হাট-বাজারের সরকারী জমি লক্ষ লক্ষ টাকায় ক্রয়-বিক্রয়

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি হাটবাজারের সরকারী জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়ের অভিযোগ উঠেছে। এভাবে সরকারী জমি ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে হাত বদলে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অবৈধ জবর-দখলদাররা। পাশের একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নাকের ডগায় অবৈধভাবে সরকারী জমি ক্রয়-বিক্রয় করা হলেও অজ্ঞাত কারণে নিরব দর্শকের ভূমিকায় সংশ্লিষ্টরা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী ও ক্রেতা-বিক্রেতা সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী হাটবাজারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চা-বাগান বাজার। এটি উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের চা-বাগান এলাকায় তুরাগ নদীর তীরবর্তী স্থানে অবস্থিত। ওই বাজারে প্রায় দেড় শতাধিক দোকানপাটের মধ্যে সরকারী জমিতেই অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় শতাধিক দোকানপাট। অথচ ওই বাজারে সরকারী ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠা মাত্র একটি দোকান।

আর বাকী সব দোকানপাট জবর-দখলকারীরা অবৈধভাবে গড়ে তোলায় রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। কিন্তু সম্প্রতি ওই এলাকার মৃত শামসুদ্দিন সরকারের ছেলে সোহেল সরকার এবং সোহেল সরকারের সৎ স্ত্রী রমিছা বেগম ও এক সৎ বোন ওই বাজারের সরকারী জমিসহ ৩/৪টি দোকান স্ট্যাম্পে চুক্তি মাধ্যমে বিক্রয় করেন। তারা জমিসহ দোকান প্রতি প্রায় ৯ লক্ষ টাকা থেকে ১৩ লক্ষ টাকা করে মূল্য নির্ধারণ করেন। এভাবে তারা ওই হাটবাজারের সরকারী জমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রয় করে প্রায় ৩৪ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

অথচ ওই বাজারের সন্নিকটে ফতেপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস রয়েছে। ওই অফিসের নাকের ডগায় এভাবে সরকারী জমি স্ট্যাম্প করে কৌশলে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অবৈধ জবর-দখলকারীরা। অথচ সেখান দিয়েই আসা-যাওয়া করলেও সরকারী জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়ে যেন কিছুই জানেন না ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) আমিনুল হক। ওই অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অজ্ঞাত কারণে নিরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাটবাজারের সরকারী জমি ক্রয়-বিক্রয় কারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নেওয়ার দাবী জানিছেন এলাকাবাসী।

ওই বাজারে সরকারী জমির ক্রেতা দেলোয়ার হোসেন দুলু জানান, শুনেছি এটা সরকারী সম্পত্তি। এই সম্পত্তি তারা লীজ নিয়ে ছিল। দীর্ঘদিন আগে শামসুদ্দিন সরকারের ওয়ারিশগণ ওই বাজারে দোকানপাট নির্মাণের পর ভাড়া দেন। আমি তাদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে হোটেল ব্যবসা করে আসছি। কিন্তু আমি জমি সংক্রান্ত বিষয় কিছু বুঝি না। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ও মেয়ে বলেছে এই সরকারী জমি বিক্রি করে দিবে।

এ জন্য ১২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে প্রায় দীর্ঘ ২২ ও প্রস্থ ২১ ফুট পরিমান জমি কিনে রেখেছি। এটা সরকারী জমি হওয়ায় দলিল হবে না, তাই তারা স্ট্যাম্প করে দিয়েছেন। সরকারী জমি কেন কিনলেন? জানতে চাইলে তিনি জানান, বিক্রেতারা বলেছেন এই জমি আমার নামে লীজ নিয়ে দিবেন। এছাড়াও এভাবেই স্ট্যাম্পের মাধ্যমে এ বাজারে জমি বেচা-কেনা হচ্ছে। তাই সবার যে গতি হবে, আমারও সে গতিই হবে।

এটা ভেবেই এই জমি কিনে রাখলাম। অপর ক্রেতা ঢাকা হোটেলের মালিক নুরুল আমিন জানান, আমি দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া নিয়ে এখানে হোটেল ব্যবসা করে আসছি। কিন্তু গত ১/২ বছর আগে সোহেল সরকার ওই জমির মালিক দাবী করে ৯ লক্ষ টাকার বিনিময়ে আমার কাছে বিক্রি করেন। শুধু দেলোয়ার হোসেন দুলু ও নুরুল আমিনই নন, ওই পরিবার ছাড়াও আরো অনেকের কাছ থেকে এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে সরকারী জমি কিনে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর।

ওই হাটবাজারের সরকারী জমি বিক্রয়ের বিষয়ে মুঠোফোনে বিক্রেতা সোহেল সরকার অস্বীকার করলেও তার সৎ মা রমিছা বেগম জানান, ওই জমির পাশে ঘেষেই আমাদের রেকর্ডীয় জমি। সে সুবাদে ওই সরকারী জমি তো আমরাই ভোগ করবো। কিন্তু সরকারী জমি কেন বিক্রয় করলেন? জানতে চাইলে তিনি দাবী করে বলেন, এই জমি আমরা লীজ নিয়েছি। এটা সংশ্লিষ্ট অফিসও অবগত আছে। আর আমাদের প্রয়োজন ছিল বলেই ওই জমি বিক্রি করেছি। আমরা ছাড়াও আরো অনেকেই এভাবে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। এটা নিউজ করার কি আছে?

ওই ফতেপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) আমিনুল হক জানান, ওই বাজারে প্রায় ২৭৮ সতাংশ সরকারী সম্পত্তি আছে। ওই সরকারী সম্পত্তিতে অবৈধভাবে দোকানপাট করেছে দখলকারীরা। কিন্তু ওই বাজারের সরকারী সম্পত্তি বিক্রির বিষয়টি আমাদের জানা নেই। গোপনে টাকার বিনিময়ে স্ট্যাম্প করে জমি হস্তান্তর করে থাকলে সেটা আমাদের জানার কথা না। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এএইচ এম ফখরুল হোসাইন জানান, ওই বাজারের জমি পেরিফেরি ভুক্ত। পেরিফেরি তালিকা করে গাজীপুর জেলা প্রশাসক স্যারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও ওই বাজারের জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়ে কেউ অভিযোগ দেয়নি। তারপরও যদি ওই বাজারে সরকারী জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ঘটনা ঘটে, তাহলে খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

Ads