স্বপ্ন ভাঙার পরও গ্লাভস ছাড়েননি সৈয়দপুরের মোক্তার সিদ্দিকী

মোঃ জহুরুল ইসলাম খোকন, সৈয়দপুর প্রতিনিধি (নিলফামারী)ঃ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:৩১ অপরাহ্ণ
স্বপ্ন ভাঙার পরও গ্লাভস ছাড়েননি সৈয়দপুরের মোক্তার সিদ্দিকী

‎নীলফামারীর সৈয়দপুরে বসবাস করেন মোক্তার সিদ্দিকী। গতদিনে ছিলেন জাতীয় দলের প্রাথমিক স্কোয়াডে থাকা এক প্রতিভাবান ক্রিকেটার। স্টাম্পের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো।

‎১৯৯২ সালে সৈয়দপুরের ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্রিকেট দিয়ে যাত্রা শুরু হয় তার। কিপিংয়ে দ্রুততা আর নিচের দিকে ব্যাটিংয়ে আক্রমণাত্মক উপস্থিতি তাকে দ্রুত আলোচনায় নিয়ে আসে। ওল্ড ডিওএইচএস ক্লাবের হয়ে কোয়ালিফাইং লীগে খেলে ডাক পান অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলে। যদিও অজ্ঞাত কারণে সেই ট্যুর বাতিল হয়, তবে ক্যাম্পে দেশসেরা কোচদের অধীনে অনুশীলনের সুযোগ পান তিনি। সেখানেই নিজেকে আরও শানিত করেন।

‎১৯৯৪ সালে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তরার হয়ে খেলতে যান। একক নৈপুণ্যে দলকে ফাইনালে তোলেন এবং টানা দুই বছর লীগসেরা উইকেটকিপারের স্বীকৃতি পান মোক্তার সিদ্দিকী। ১৯৯৬ সালে প্রথম বিভাগের দল আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন তিনি। তার পারফরম্যান্সে দল প্রিমিয়ার লীগে উন্নীত হয়। ১৯৯৭ সালে প্রিমিয়ার লীগে তার কিপিং ও ব্যাটিং নজর কাড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ও বাংলাদেশি কোচ গর্ডন গ্রিনিজের ।

‎সেই বছর মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আইসিসি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি-র ৪৪ সদস্যের প্রাথমিক স্কোয়াডে ডাক পান মোক্তার সিদ্দিকী। এক মাসের ক্যাম্পে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে আরও ছিলেন কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত কিপার। চূড়ান্ত দলে জায়গা না হলেও তার সামর্থ্য প্রমাণিত হয়। একই বছর আজাদের হয়ে ওরিয়েন্টের বিপক্ষে ১২৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন—যা ছিল সে মৌসুমের অন্যতম সেরা ইনিংস।
‎

পরের বছর ব্রাদার্স ইউনিয়নে যোগ দেন। অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনের নেতৃত্বে লীগে সর্বোচ্চ ২৬টি ডিসমিসাল করেন এবং ব্যাট হাতে খেলেন দুটি অর্ধশতক। এশিয়া কাপের দলে ডাক পেলেও নিয়মিত কিপার থাকায় স্ট্যান্ডবাই হিসেবেই থাকতে হয় তাঁকে।

‎ক্রমাগত পারফরম্যান্সে সুযোগ পান বাংলাদেশ বিমানে খেলার। এ সময় বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা লাভ করে, আন্তর্জাতিক পরিসর বাড়ে। জিম্বাবুয়ে সফরের আগে নিয়মিত কিপার খালেদ মাসুদ (পাইলট) অনুশীলনে আহত হলে ডাক আসে মোক্তারের। জাতীয় দলে অভিষেকের স্বপ্ন তখন একেবারে সামনে।

‎কিন্তু নিয়তি নির্মম। নেট অনুশীলনেই ডান পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায় তার। ডাক পেয়েও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা আর হলো না। ভারতে চিকিৎসা নিয়ে আবার মাঠে ফেরেন। এরপর আবাহনী, মোহামেডান, সূর্যতরুণসহ শীর্ষ ক্লাবগুলোতে দীর্ঘ ১৫ বছর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলেছেন। দ্রুতগতির বোলার হোক বা স্পিনার—স্টাম্পের পেছনে তিনি ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক।

‎অবসরের পর কোচিংয়ে মনোনিবেশ করেন। লেভেল ওয়ান কোচিং সম্পন্ন করে জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পেলেও স্থানীয় রাজনৈতিক জটিলতায় তা কার্যকর হয়নি।
‎তিনি নিজেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এর আদর্শের অনুসারী বলে উল্লেখ করেন এবং দীর্ঘ ১৭ বছর বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আশার কথা বলেন তিনি।

‎জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ২০২৪ সালে। একমাত্র ছেলে ইসমাইল অসুস্থ হয়ে মারা যায়। সেই শোক তাকে ভেঙে দেয়। স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে ছোট সংসার। জীবিকার তাগিদে শুরু করেন গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি।

বাজারে ঘুরে ঘুরে সিলিন্ডার সরবরাহ করেন। কেউ চিনে ফেললে মৃদু হেসে বলেন—“জীবন থেমে থাকে না। তবু ক্রিকেট ছাড়েননি। সৈয়দপুরের ফাইভ স্টার মাঠে প্রতিদিন বিকেলে প্রায় ৩০ জন শিশুকে বিনা পারিশ্রমিকে প্রশিক্ষণ দেন। কারও গ্লাভস ঠিক করেন, কারও স্ট্যান্স শোধরান। ক্রিকেটই তার মানসিক আশ্রয়।

‎বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক বাঁহাতি ওপেনার হুমায়ুন কবির বলেন, মুখতারের মতো কিপিং প্রতিভা বিরল। ‘পাইলট’ যুগে না জন্মালে দীর্ঘদিন জাতীয় দলে খেলতে পারতেন। তবে অবসরের পর তাকে মূল্যায়ন করলে বাংলাদেশ ক্রিকেট লাভবান হতো। বিসিবির উচিত তার অভিজ্ঞতা ও মেধা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া।

‎একই কথা বলেন নীলফামারী জেলা কোচ জামিউল আলম বাবলু। মোক্তার সিদ্দিকীর মতো অভিজ্ঞদের জায়গা হলে দেশীয় ক্রিকেট আরও সমৃদ্ধ হতো। তার ঘাটতি উত্তরাঞ্চলসহ দেশের ক্রিকেটে অনুভূত হয়।

‎মুখতার সিদ্দিকীর গল্প কেবল একজন ক্রিকেটারের অপূর্ণ স্বপ্নের নয়। এটি লড়াইয়ের গল্প। গৌরবময় দিন পেরিয়ে আজ তিনি সংগ্রামী মানুষ। তবু বিকেলের মাঠে গ্লাভস হাতে দাঁড়ালে চোখে আবার জ্বলে ওঠে সেই পুরোনো আগুন।

‎হয়তো তিনি জাতীয় দলের কিপার নন, কিন্তু নতুন প্রজন্মকে শেখাচ্ছেন—স্বপ্ন ভাঙলেও লড়াই থামে না। জীবনের উইকেট রক্ষা করতে হলে শেষ বল পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই আশা নিয়েই ক্রিকেট মাঠ আর জীবন যুদ্ধের মাঠ ছাড়েননি মোক্তার সিদ্দিকী।

Ads