তানোরে এলজিইডির রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়ম!! কাজ শুরুর আগে সাইনবোর্ড দেয়ার দাবি

আব্দুস সবুর, তানোর প্রতিনিধি (রাজশাহী) ঃ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
তানোরে এলজিইডির রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়ম!! কাজ শুরুর আগে সাইনবোর্ড দেয়ার দাবি

রাজশাহীর তানোরে এলজিইডির রাস্তার কাজে ব্যাপক অনিয়ম দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিম্মমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে চলছে রাস্তার কাজ। আবার পুরাতন মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। গত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর থেকে আওয়ামী পন্থী ঠিকাদারেরা কাজ রেখে আত্মগোপনে চলে যায়। সেই সুযোগে আরেক পন্থী ঠিকাদারদের ঘটে আগমন।

তারা অগ্রিম ৫/৭% লাভ দিয়ে কাজ কিনে দায়সারা ভাবে করছেন। কার্পেটিং করার সপ্তাহ না যেতেই উঠে যাচ্ছে পিচ পাথর। কাজের সময় অফিসের কোন লোকজন থাকেনা বা থাকলেও ম্যানেজ করে চলছে অনিয়মের কাজ। আর এসব কাজ কিনা বেচা করে থাকেন খোদ এলজিইডি অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

এছাড়াও প্রতিটি রাস্তার কাজের আগে সাইনবোর্ড দেয়ার দাবি তুলেছেন জনসাধারণ। কারন সাইনবোর্ড দিলে কি পরিমান বালু খোয়া দেয়া লাগবে, রাস্তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, কি পরিমান, কার্পেটিং কত ইঞ্চি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও কাজের বরাদ্দ কত।

এসব বিস্তারিত তুলে কাজের আগে সাইনবোর্ড দিলে অনেকাংশে অনিয়ম কম হতে পারে। কারন কৃষক ও সাধারণরা কোনভাবেই রাস্তার কাজের বিষয়ে কিছুই জানেনা। নব নির্বাচিত এমপি ও বর্তমান সরকারের কাছে এসব দাবি তুলেছেন।
এদিকে অফিসের ওয়েব সাইডে কাজের বিস্তারিত দেয়ারও দাবি তুলেছেন সচেতন মহল।

জানা গেছে, উপজেলার কলমা ইউনিয়ন ইউপির কুজিশহর গ্রামে যাওয়ার রাস্তা নির্মানের কাজ করছেন শহরের প্রভাবশালী মামুন নামের ঠিকাদার। প্রতিটি কাজ অফিস কর্তাদের যোগসাজশে কেনা বেচা হয়। অথচ দরপত্রে যিনি কাজ পাবেন তাকেই করতে হবে এমন নিয়ম থাকলেও কোন কার্যকরীতা নেই।

জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে উপজেলায় নতুন ও পুরাতন মিলে বেশকিছু রাস্তার কাজ চলমান রয়েছে। কাজগুলো দরপত্রে পেয়েছেন এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, তার নিকট থেকে এলজিইডি অফিসের কতিপয় সিন্ডিকেট এসও, র মাধ্যমে কাজ কিনে পুরাতন সামগ্রী ব্যবহার করে নির্মাণ কাজ চলছে। ভোটের সময় দ্রুত কাজগুলো শুরু করা হয় এবং ভোটের পরপর নতুন সরকার গঠনের সাথে সাথে কাজ শুরু হয়েছে বেশকিছু এলাকায়।

উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়ন ইউপির বনকেশর থেকে কয়েলহাট পর্যন্ত ১৯৫০ মিটার নতুন রাস্তা নির্মান করা হচ্ছে। রাস্তাটি দরপত্রে পায় কেকে আর নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যার মালিক লালন। তার নিকট থেকে অগ্রিম লাভ দিয়ে কিনে বাস্তবায়ন করছেন ভূইয়া নামের আরেক জন ঠিকাদার। রাস্তাটির বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৫ টাকা।

স্থানীয়রা জানান, একেবারে নিম্মমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ঠিকাদার ইচ্ছে মত কাজ করছেন। কাজের সময় অফিসের কোন লোক থাকেনা। আবার কিছু বললেই নানা ধরনের হুমকি ধামকি দেয়। কথায় আছে নাই মামার চেয়ে কানা মামা অনেক ভাল। বর্ষা মৌসুমে এরাস্তা দিয়ে চলাচল করা যায়না। এত পরিমান অনিয়ম হচ্ছে রাস্তা টিকসই হবে না।

দরগাডাঙ্গা বাজারের পূর্ব দিকে শংকর পুর যাওয়ার কার্পেটিং রাস্তা মেরামত করছেন শহরের প্রভাবশালী বিএনপি পন্থী ঠিকাদার মামুন। কুজিশহর গ্রামে যাওয়ার রাস্তাটিও করছেন মামুন। তানোর পৌর এলাকার চাপড়া ও আমশো গ্রামের রাস্তাটিও করছেন মামুন। তিনি উপজেলার প্রায় রাস্তার কাজ করে আসছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় রাস্তার কাজ কিনে করছেন তিনি ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তার পুরাতন খোয়া পিচ দিয়ে রাখা আছে। এজিং করা হচ্ছে নতুন পুরাতন ইট দিয়ে। এজিংয়ের দুপাশে নতুন খোয়া বালির পরিবর্তে ভিজে স্যাতসেতে মাটি ও নামমাত্র পুরাতন খোয়া দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চললেও অফিসের কোন কর্তার দেখা মিলছেনা। তারা অফিসে বসেই সবকিছু করছেন।

স্থানীয়দের দাবি, কয়েকদিন পর থেকে আলু উত্তোলন শুরু হবে। আর এসময় রাস্তার কাজ চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে কৃষকদের দূর্ভোগের শেষ থাকবে না। আবার দ্রুত কাজ শেষ করতে নানামুখী অনিয়ম করা হচ্ছে।

তানোর পৌর এলাকার আমশো থেকে মোহর ১৫০০ মিটার রাস্তার কাজ করছেন রহমানিয়া নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এরাস্তাটি অতীতে পৌরসভা করেছিল। কিন্তু পৌরসভার পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা বা মানের দিকে ভালো করার জন্য এলজিইডি কে হস্তান্তর করা হয়। চাপড়া গ্রামের রাস্তাটিও পৌরসভার। ভালোমানের জন্য এলজিইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে পৌর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেন।

এছাড়াও মোহর থেকে কাশিমবাজার পর্যন্ত নতুন রাস্তা নির্মান হচ্ছে। আড়াই কিলোমিটার রাস্তা নতুন ভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে। রাস্তাটির কার্যাদেশ পাই ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

তার নিকট হতে শহরের প্রভাবশালী অসিম নামের ঠিকাদার অগ্রিম লাভ দিয়ে কিনে করছেন। এই অসিম আ”লীগ সরকারের সময় উপজেলায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা নতুন ভাবে নির্মাণ করেছিলেন। রাস্তা গুলো দেড় দুই বছর না যেতেই খোয়া পিচ উঠা শুরু করে এবং ভয়ংকর গর্তে রুপ নিয়েছে। তিনি আবার অনিয়ম ভাবে কাজ শুরু করেছেন।

পৌর এলাকার চাপড়া রাস্তা নির্মানের জন্য দুটি প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করা হবে। নিম্মমানের ইট খোয়া ও পিলার ব্যবহার করা হচ্ছে। এজিংয়ে নতুন ইট যেমন তেমন দিলেও পুরাতন ইটের পরিমান বেশি। দীর্ঘ এক সপ্তাহ ধরে কাজ চললেও কোন কর্তার দেখা মিলছেনা বলে অভিযোগ করেন গ্রামের জনসাধারণ।

আমশো রাস্তায় কয়েকটি কার্লভাট নির্মাণ করা হয়েছে একেবারেই নিম্নমানের। যা বর্ষা মৌসুমে পানির সাথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রাস্তায় দেয়া হয়েছে পুরাতন সামগ্রী। যা কার্পেটিংয়ের পরপরই উঠে যাবে। এভাবেই প্রতিটি রাস্তার কাজে প্রচুর অনিয়ম দূর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে।

সুত্র জানায়, এলজিইডি অফিসের এসও শাহিন সালাম নামের এক কর্তার কাছে জিম্মি হয়ে আছে। যাবতীয় দায়িত্ব তিনি পালন করে থাকেন। কোন রাস্তা কার কাছে বিক্রি করতে হবে, কার কাছে বিক্রি করলে তার কাছে পারসেন আসবে সেটা নিয়েই মহা ব্যস্ত থাকেন তিনি বলেও অহরহ অভিযোগ । উপজেলায় প্রকৌশলী হিসেবে নুর নাহার যোগদানের পর থেকে শাহিন সালামের রাজত্ব বেড়ে যায়। নুর নাহার কোন সময় কাজ দেখভাল করতে যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে । সবকিছু দেখভাল করেন শাহিন সালামের নেতৃত্বে।

যার প্রমান হাতিশাইল স্কুলে যাওয়ার রাস্তা কার্পেটিং করার পর থেকে পিচ পাথর উঠে যাচ্ছে। এনিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। কারন দেশের মাথা নেই, যার কারনে আরামসে চলছে অনিয়ম।

গত বৃহস্পতিবার এলজিইডির প্রকৌশলী নুর নাহারের সাথে মোবাইলে কল দেয়া হলে রিসিভ করে জানান, আপনাদের এত দেখার পরও কেন নিউজ হবে। কাকে আপনি দেখলেন জানতে চাইলে পুনরায় পরিচয় জেনে বলেন আমি অন্যজন ভেবেছি।

রাস্তার কাজের বিষয়ে তথ্য নিতে চাই তিনি বলেন, একসাথে নয়টা রাস্তার কাজ হচ্ছে। কাজ শেষ হোক তারপর তথ্য নিয়েন। কাজে ব্যাপক অনিয়ম করা হচ্ছে এবং পুরাতন সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এধরণের কাজ করার কোন সুযোগ নেই। রবিবারে আসেন তথ্য দেয়া হবে। রবিবার সকালের দিকে অফিসে গিয়ে তথ্য চাইলে তিনি এসও শাহিন সালাম কে ডেকে তথ্য দিতে বলেন।

শাহিন সালাম কয়েকটি রাস্তার তথ্য দিতে গিয়ে বলেন, তথ্য অধিকারে আবেদন করেন তথ্য দেয়া হবে। আপনার স্যার বলেছে তথ্য দিতে আপনি কি স্যারের চেয়েও বড় কর্মকর্তা নাকি জানতে চাইলে তিনি জানান, আমার রুমে মেহমান আছে।

এজন্য তাড়াহুড়ো করছি। রাস্তার কাজে পুরাতন মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি জানান, দুএক জায়গায় এমন হতেই পারে। পুরাতন মালামাল রাস্তায় দেয়া যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, যিনি দরপত্রে কাজ পেয়েছে সে বিক্রি করে দিয়েছে এজন্য রাস্তায় দিচ্ছে। দিতে পারে কিনা প্রশ্ন করা হলে, কোন সদ উত্তর দেননি তিনি।

Ads