তানোরের সরনজাই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দরিদ্রদের সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাত

আব্দুস সবুর, তানোর প্রতিনিধি (রাজশাহী) ঃ
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ১১:৪৫ অপরাহ্ণ
তানোরের সরনজাই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দরিদ্রদের সঞ্চয়ের টাকা আত্মসাত

রাজশাহীর তানোর উপজেলার সরনজাই ইউনিয়ন ইউপি চেয়ারম্যান উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব মোজাম্মেল হক খাঁনের বিরুদ্ধে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাসিক ভি, ডাব্লিউ,বি প্রকল্পের মাসিক সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংক একাউন্টে জমা না করে নিজ পকেটে রেখে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এখবর ছড়িয়ে পড়লে ইউপির আপামর জনসাধারণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সেই সাথে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে যতগুলো প্রকল্পের কাজ করেছেন সবগুলোর সরেজমিনে তদন্ত করলেই ভয়াবহ অনিয়ম দূর্নীতি বেরিয়ে পড়বে বলে মনে করছেন ইউপির সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, গত বছরের জুলাই মাস থেকে উপজেলার সরনজাই ইউনিয়ন ইউপিতে নতুন ভাবে ভি,ডাব্লুউ,বি প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জনসাধারণ মাথা পিছু ৩০ কেজি করে চাল পেয়ে থাকেন।

প্রতিজনের ৩০ কেজি চালের বিপরীতে ২৪০ টাকা করে মাসিক সঞ্চয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এজন্য প্রতি উপকারভোগীকে ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে। কিন্তু গত জুলাই মাস থেকে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত কোন উপকার ভোগীর সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংকে জমা দেননি ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক খাঁন।

ইউপি সদস্যরা জানান, গত জুলাই মাস থেকে নতুন ভাবে প্রকল্প শুরু হয়েছে। সরনজাই ইউপিতে উপকারভোগীর সংখ্যা রয়েছে ১৭০ জন। গত জুলাই থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসের কোন টাকা ব্যাংকে জমা করেননি চেয়ারম্যান। অথচ আমরা জানতে চাইলে তিনি সাব জানিয়ে দিতেন টাকা জমা দেয়া আছে।

তিনি একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি সে কেন এসব টাকা নিজের পকেটে রাখবে। সে তো নতুন চেয়ারম্যান না। তিনি আ”লীগ সরকারের সময় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই সময় প্রকল্পের কাজে তেমন অনিয়ম করত না। পরে সাবেক এমপি ফারুক চৌধুরীর হাত থেকে মালা নিয়ে দলে যোগদানের পর থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি।

বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আ”লীগ সরকারের পতনের পর তিনি উপজেলা বিএনপির এক প্রকার কর্নধর হয়েছে। ইউনিয়নে পরিষদে ঠিক মত আসেনা। প্রকল্পের কাজ তার অনুগত মেম্বার ছাড়া দেয়না। তার কথায় ইউনিয়ন পরিষদে শেষ কথা। ইচ্ছে মত সবকিছু পরিচালনা করে থাকেন।

এক ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে টাকা জমা হয়নি মর্মে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন ভাবে জানতে পারি এক টাকাও ব্যাংকে জমা করেননি। সে একজন চেয়ারম্যান আবার সে হাজী। আবার ক্ষমতাসীন দলের উপজেলার সাবেক সভাপতি। তারমত ব্যক্তিকে এসব টাকা কেন পকেটে রেখে দিতে হবে।

দলীয় নেতারা জানান, আ”লীগ সরকার পতনের পর থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে মোজাম্মেল হক খান বেপরোয়া চলাফেরা শুরু করেন। তার নানা অপকর্মের জন্য গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার ইউনিয়নে ধানের শীষের প্রার্থী ভোট কম পায়। দলীয় সুযোগে অসহায় দরিদ্রদের টাকা আত্মসাত করলে ভোট কেনই দিবে।

এধরনের নেতাদেরকে দলীয় ভাবে কঠোর শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। তাহলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে এধরনের অনিয়ম করতে সাহস পাবেনা। প্রশাসনকেও অনুরোধ করব যাতে এসব বিষয়ে কোন ছাড় দেয়া না হয়।

সুত্র জানায়, সরনজাই ইউপিতে ভি,ডাব্লুউ,বি প্রকল্পের আওতায় ১৭০ জন দরিদ্র জনগোষ্ঠী মাসে ৩০ কেজি করে চাল পেয়ে থাকেন। আর মাসিক ২৪০ টাকা করে ব্যাংকে সঞ্চয় রাখতে হবে। দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প। গত বছরের জুলাই থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসের চাল বিতরণ করা হয়েছে।

মাসে ২৪০ টাকা করে হলে ৮ মাসে জনপ্রতি সঞ্চয় হয় ১ হাজার ৯২০ টাকা। সে হিসেবে ১৭০ জন উপকারভোগীর ৩ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ টাকা আত্মসাত করেছেন চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক খান।

চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আলহাজ্ব মোজাম্মেল হক খাঁনের ০১৭৭৬৮৬১৮০০ মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও সে রিসিভ না করার কারনে তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্যানেল চেয়ারম্যান সইবুর রহমানের ০১৭৩১৭৭৬৬৫০ মোবাইল নম্বরে ফোন দেয়া হলে তিনি রিসিভ করেন। সঞ্চয়ের টাকা ব্যাংকে জমার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানিনা।

ইউপি সচিব মুর্শেদুর রহমান মুরাদের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি গত দুই মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। এসব বিষয়ে এতটা জানিনা। তবে কিছু সাংবাদিক এসেছিল চেয়ারম্যানের কাছে তাদের কে ব্যাংকো টাকা জমার কাগজপত্র দেখিয়েছে বলে শুনলাম।

কোন ব্যাংকে টাকা জমা করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান কালীগঞ্জ কৃষি ব্যাংকে। এরবেশি কিছু জানিনা।

কালীগঞ্জ কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার রুমানের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে টাকা জমার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অন্যজনের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানান এধরনের প্রকল্পের টাকা জমা হয়নি। তবে তানোর শাখায় হতে পারে।

তানোর কৃষি ব্যাংকে গিয়ে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে সরনজাই ইউপির ভি,ডাব্লিউ,বি প্রকল্পের টাকা জমা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ম্যানেজার জানান হিসাব নম্বর দিলে হয়তো বলা যাবে। তবে সরনজাই ইউনিয়নের এধরনের টাকা এখানে না, কৃষি ব্যাংক হলে কালীগঞ্জ শাখায় জমা হতে পারে।

প্রকল্প তদারক কারী সংস্থা মহিলা দপ্তরের কর্মকর্তা হাবিবা খাতুনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, চেয়ারম্যানের এখতিয়ার নাই উপকার ভোগীদের ব্যাংক হিসেবে টাকা জমা রাখার।

উপকারভোগী নিজে ব্যাংক হিসাব খুলে প্রতি মাসে জমা রাখতে হবে। কিন্তু কোন গ্রাহকতো রাখেনা জানতে চাইলে তিনি জানান,চাল বিতরণের সময় ট্যাগ অফিসার থাকে তার সব কিছু বলার কথা। কিন্তু এধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এখন পেয়েছি খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্যাগ অফিসার উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আমীর হামজার মোবাইলে ফোন দেয়া হলে একজন মহিলা রিসিভ করে বলেন স্যার তো কথা বলতে পারেনা। চাল বিতরণের সময় আমাকে পাঠায়। তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান আমার নাম সোনালি, সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা। তিনি জানান, আমি শুধু চাল সঠিক ভাবে দেয়া হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে দেখাশোনা করি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও নাঈমা খাঁন জানান, বিষয় টি অজানা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে বিষয় টি সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া হবে। ঘটনার সত্যতা পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Ads