ভূমি সমস্যা ও সমাধান

জিনিউজ ডেস্ক ২৪
প্রকাশিত: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ২:১৩ অপরাহ্ণ
ভূমি সমস্যা ও সমাধান

ঃ মোঃ সেলিম মিয়া ঃ দুর্নীতি ও ঝামেলামুক্ত উন্নয়নশীল দেশ সকলের কাম্য। এরকম দেশ গঠনের লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলকভাবে নতুন-পুরাতন জনগুরুত্বপুর্ণ অনেকগুলো উন্নয়নমূলক কর্মসূচির কথা উল্লেখ্য করেছিলেন দলীয় ইশতেহারগুলোতে । কিন্তু বরাবরের মতো এবারো ভূমি সমস্যার কথা ইশতেহারগুলোতে গুরুত্ব পায়নি। অথচ ভূমি সমস্যা দেশের বড় ও স্থায়ী একটি সমস্যা। তবে ব্রিটিশ আমল থেকে বিগত সরকারের আমল পর্যন্ত সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্ত কাঙ্খিত সমাধান হয়নি। কর্মরত কতিপয় অসাধু ব্যক্তির অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও পেশাগত অদক্ষতার কারণে অধিকাংশ দলিল, রেকর্ড ও নামজারীতে বিভিন্ন ধরণের ভুল।

এ সকল ভুলের কারণে দেশে প্রায় ৭০ ভাগ ভূমি মালিক কম-বেশি ভোগান্তিতে আছেন এবং সৃষ্টি হচ্ছে পরস্পরে বিরোধ। ছিন্ন হচ্ছে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও জমির অফিস ও কাগজ সমন্বয়হীন, জটিল ও দুর্বোধ্য রয়েছে, সঠিকভাবে সংস্কার হয়নি। সঠিক সংস্কার, ভূমির বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণার অভাবে অনেক শিক্ষিত মানুষ জমির কাগজ ভালো বুঝেন না, বুঝেন না কোন কাগজের কি গুরুত্ব।

অজ্ঞতাবশত যার নামে যে কাগজ বলে জমির দাবী করে প্রতিদিন দেশে কোথাও না কোথাও দাঙ্গাহাঙ্গামা, খুনাখুনি মামলা মোকদ্দমা হচ্ছে। দীর্ঘ গবেষণায় দেখা যায় ভুমি বিরোধে মাসে ১৭/১৮ জনের উর্ধ্বে খুন হচ্ছে। খুনের বিচারও হচ্ছে। কিন্তু বিরোধীয় জমির ফয়সালা হচ্ছে না সহনীয় সময়ে। প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো ব্রিটিশ আমলের খাস পদ্ধতি ও দখল স্বত্ব বলবৎ থাকায় বিশেষ করে নতুন চর দখল নিয়ে শুরু হয় ভূমিদস্যুতা- জোর যার মুল্লুক তার, লাঠি যার মাটি তার।

এতে অনেক দুর্বলের জমি চলে যাচ্ছে সবলের দখলে, কর/খাজনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সরকার, অনেক ভূমি মালিক হারাচ্ছেন মালিকানা। মালিকানা নিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে সিভিল-ফৌজদারীসহ বিবিধ মামলা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশে প্রায় ৭৫ ভাগ মামলাই ভূমি কেন্দ্রিক। ফলে দেশের আদালতগুলোতে দেখা দিয়েছে মামলাজট, বিচারক ও এজলাস সংকট। এতে বিচারপ্রার্থীদের বাড়ছে দুর্ভোগ এবং বিচার বিলম্বের কারণে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে শঙ্খা।

ভূমি মামলা জালে আটকা পড়ে মাঠ ছেড়ে ২/৩ যুগ ধরে কোর্টের বারান্দায় ঘুরতে অনেক কৃষক নিঃস্ব দিনমজুর হচ্ছেন। রায় পেলেও দখল পান না সহজে। জমির অফিস ও কাগজ সমন্বয়হীন, জটিল ও দুর্বোধ্য থাকায় সহজ সরল মানুষকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আবার কোন সময় অস্বস্তিতে ফেলে অসাধুরা দুর্নীতির মাধ্যমে ফায়দা লুটছেন আর সেবা গ্রহিতারা ক্ষতিগ্রস্থ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

ভূমি সেবায় অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে! কেউ প্রতিবাদের ভাষায় কথা বললে অসাধুরা তার জমি খাস অথবা অন্যের নামে রেকর্ড করে দেয়, জমির কাগজ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে কর্তারা যা বুঝায় তাই বুঝতে হয়। চরাঞ্চলের সহজ সরল ভূমি মালিকেরা আদিকাল থেকে অসহায়। ভূক্তভোগীদের বিনীত প্রশ্ন হয়রানী ও ঝামেলামুক্ত সেবা পাওয়ার উপায় কবে আবিস্কার হবে? দেখা যাচ্ছে শাসন আর বদলীতে কোন কাজ হচ্ছে না।

অসাধুরা কিছুতেই সংশোধন হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে অসাধু-দুর্নীতিবাজদেরকে শাসন আর বদলী করা যেন ঘরে তালা দিয়ে চাবী তালাতেই ঝুলিয়ে রাখার সমান। কারণ দুর্নীতির দায়ে বদলী করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাস্তির বদলে আরো বেশি অনৈতিক সুবিধা পেয়ে থাকে। তাই শুধু শাসন আর বদলী নয়, অনিয়ম-দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতি রোধে এবং নির্ভুল ভূমি সেবার জন্য সিস্টেম চালু তথা ডিজিটাল ভূমি কার্ড/বই প্রবর্তন করা আবশ্যক।

ডিজিটাল ভূমি কার্ড/বই প্রবর্তন হলে-নারী-পুরুষ সকল ভূমি মালিকের থাকবে সমন্বয়যোগ্য, সহজবোধ্য ও জবাবদিহিতামূলক ডিজিটাল ভূমি কার্ড/বই। নিশ্চিত হবে ভূমি মালিকানা, প্রতিষ্ঠা হবে নারী ও আদিবাসীদের ভূমি অধিকার। নির্ভুল হবে জমির দলিল, রেকর্ড ও নামজারী। বইয়ে হবে যোগ বিয়োগ, হিসাব থাকবে সফ্টওয়্যারে। কে কতটুকু জমির মালিক দেখা যাবে সকল স্থান থেকে। গোপন থাকবে না জমির কাগজ ও সম্পদ এবং জমি ক্রয়ে উর্ধ্বসীমা লঙ্ঘনের সুযোগ।

কাগজ খোয়া গেলে সমস্যা হবে না। বেড়িয়ে আসবে দেশের মালিকানা, খাসসহ সকল প্রকার জমির সঠিক তথ্য। সঠিকভাবে আদায় হবে জমির কর/খাজনা, রোধ হবে রাজস্ব ফাঁকি ও অর্থ আত্মসাৎ। দুর্নীতিমুক্ত ও সহজ হবে ভূমিসেবা, অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন। বিলুপ্ত হবে ব্রিটিশ আমলের নদী সিকস্তি ও দখল স্বত্ত্ব, অপ্রচলিত ভাষা ও পুরোনো আইন। কমবে ভূমি বিরোধ, মামলাজট, দীর্ঘ সূত্রতা, বিজ্ঞ আদালতের আদেশ ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য প্রবণতা।

সুরক্ষিত হবে রেকর্ড রুম ও বৃদ্ধ পিতা-মাতা। রোধ হবে মাদক, ভূমিদস্যুতা ও অবৈধ দখলদার, রক্ষা পাবে কৃষি জমি, জলা, বন ও পাহাড় ভূমি। প্রবাসী ও দূর্বলের জমি হবে নিরাপদ। এছাড়া ভুল-ভুয়ামুক্ত হবে এনআইডি, জন্ম-মৃত্যুর সনদ, ভোটার তালিকা ও শুমারী সমূহ। নিরসন হবে নমিনী, নাবালক, দত্তক, দিক ও ম্যাপ জটিলতা। বন্ধ হবে জীবিতকে মৃত্যু আর মৃত্যুকে জীবিত দেখা। ভুয়া তথ্যে হবে না আর্থিক লেনদেন ও মামলা। সহজ হবে ন্যায়বিচার ও সুশাসন। কমবে স্ট্যাম্প জালিয়াতি ও ঋণ খেলাপী। এনবিআর করারোপ করতে পারবেন সহজে। সমাধান হবে সাবেক সীটমহলের ভূমি সমস্যা।

আসুন আমরা ঝামেলামুক্ত শান্তিময় দেশে গড়ি, ডিজিটাল ভূমি কার্ড/বই পরবর্তন করি।

লেখক ঃ মোঃ সেলিম মিয়া, স্বাধীন ভূমি গবেষক ও লেখক, পরিচালক- তথ্য ও গবেষণা
কনসোর্টিয়াম অফ স্ট্রাটেজিক সল্যুশন লিঃ
সদস্য-বাংলাদেশ কৃষি ঐক্য ফাউন্ডেশন।

selimmia174@gmail.com

Ads