সৈয়দপুরে ব্যক্তির নামে রেলওয়ের জমি নাম জরি জলাশয় ও পতিত জমি প্লট আকারে বিক্রি

মোঃ জহুরুল ইসলাম খোকন, সৈয়দপুর প্রতিনিধি(নীলফামারী)ঃ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬, ৫:৫৪ অপরাহ্ণ
সৈয়দপুরে ব্যক্তির নামে রেলওয়ের জমি নাম জরি জলাশয় ও পতিত জমি প্লট আকারে বিক্রি

নীলফামারীর সৈয়দপুরে রেলওয়ের জমি পর্যক্রমে দখল হয়ে যাচ্ছে। কেউ করেছে নিজের নামে নাম জরি । আবার কেউবা জলাশয় ও পতিত জমি প্লট আকারে বিক্রি করে চলেছেন।২০২২ সালে রেলের ভূমি ব্যবস্থাপনার কমপ্লায়েন্স নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সব মিলিয়ে ৪২৭ একর জমি অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে যাওয়ার তথ্য উঠে আসে। দখল হওয়া এসব জমির মধ্যে ১৫ দশমিক ২১৮৩ একর সিএস, এসএ, আরএস, বিএস জরিপের সময় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে রেকর্ডভুক্ত এবং নামজারি করা হয়েছে। প্রতিবেদন জমা পড়ার পাঁচ বছর পার হলেও এসব জমি সংশোধনের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ। এভাবে জমি দখল হয়ে যাওয়ায় শুধু লাইসেন্স ফি বাবদই বার্ষিক ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার রেল বিভাগের ক্ষতি হচ্ছে বলে রেলকর্তৃপক্ষ মারফত জানা গেছে।

সৈয়দপুর রেল সূত্র জানায় , উপজেলা শহর সৈয়দপুর রেলওয়ের সারে ৮০০ একর ভূসম্পত্তির মধ্যে ১৮৭০ সালে ১১০ একর জমিতে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা গড়ে ওঠে। অবশিষ্ট জমির মধ্যে রয়েছে রেলের বিভিন্ন স্থাপনা ও কর্মচারীদের জন্য বসতবাড়ি। অব্যবহৃত জমির মধ্যে ৫৫ একর কৃষি, ২১ দশমিক ৩৮ একর জলাশয়, ১ একর বাণিজ্যিক হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২৫ দশমিক ৭৫ একর জমি রয়েছে পৌরসভার কাছে। আর স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত রেলের বাদবাকি ৪৩৭ একর জমি অবৈধ ভাবে দখল হয়ে গেছে। যাহার বর্তমান বাজার মুল্য ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনার কমপ্লায়েন্স নিরীক্ষা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ফিল্ড কানুনগো ৭ নম্বর কাছারি সৈয়দপুর কার্যালয়ের অধীনে বিমানবন্দর-সংলগ্ন নিচু কলোনি নির্মাণের জন্য ১৯ দশমিক ২৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়, যা ৩২টি সিএস দাগে রেলওয়ের রেকর্ডভুক্ত। কিন্তু ২০১২-২০২২ সালে সেই জমির মধ্যে ১৫ দশমিক ২১৮৩ একর ভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। এসব জমির নিবন্ধন আর পুনর্নবায়ন করা হচ্ছে না।

এছাড়া রেলকর্তৃপক্ষের ঘুস বানিজ্যে নিরব থাকায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে রেল বিভাগ। আর রেলওয়ের আইডাব্লু ও কানুনগো হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। যা রেল মন্ত্রনালয় সঠিক ভাবে তদন্ত করলেই সত্যতা পাবেন বলে জানান অনেকেই।

কমপ্লায়েন্স নিরীক্ষার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০০৬-এর নির্দেশনা প্রতিপালন না করা, অধিগ্রহণ করা সব ভূমির স্বত্ব রেকর্ড সংরক্ষণ না করা, জমির সীমানা চিহ্নিত না করা ও কৃষি, মৎস্য, বাণিজ্যিক প্রভৃতি জমির রেকর্ড সংরক্ষণ না করা এবং সব ধরনের জমির হিসাব রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ না করায় রেলের প্রকৃত জমির হিসাব সংরক্ষণে অনিয়ম হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রেলওয়ের জমি দখল ও ব্যক্তির নামে রেকর্ড এবং নামজারির সঙ্গে খোদ স্থানীয় ভূমি অফিস ও রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি জড়িত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৮৫ সালে সৈয়দপুর রেলওয়ে ২৫ দশমিক ৭৫ একর জমি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয় । চুক্তি অনুযায়ী, জমির মালিকানা রেলের কাছেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু পৌরসভাকে দেওয়া ওই ২৫ দশমিক ৭৫ একরের ওপর ভিত্তি করেই রেলওয়ের জমি দিন দিন বেদখল হচ্ছে। এতে স্হাপনা নির্মানে পৌরকর্তৃপক্ষ যতটা না লাভবান হয়েছেন তার চেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন আইডাব্লু সরিফুল ইসলাম ও কানুনগো সাইফুল ইসলাম। তারা প্রত্যেককে হয়েছেন কোটিপতি।

রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ রোবায়েতুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘শুধু জমি নয়, রেলের ১ হাজার ৪০০ বসতবাড়ির মধ্যে অর্ধেকের বেশি বেদখল হয়ে গেছে। রেলওয়ে কোয়ার্টার ভেঙে অনেক দখলদার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি গড়ে তুলেছেন। রেললাইন সংলগ্ন পর্যায় ক্রমে নির্মাণ হচ্ছে বহুতল মার্কেট। এগুলোতে নেসকো অর্থের বিনিময়ে বিদ্যুৎ-সংযোগও দিয়েছে। আর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গাফিলতি ও যোগসাজশে রেলওয়ের জমি অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে নামজারি হয়েছে। কিন্তু স্হানীয় রেলকর্তৃপক্ষের কোন মাথা ব্যাথা নেই।

স্হানীয়রা জানান, ২০১০ সালে শহরের কাজি পাড়া হঠাৎ বস্তি এলাকায় হুমায়ুন নামের এক যুবক প্রায় ৩ একর রেলওয়ের জলাশয় লীজ নিয়ে মাছ চাষাবাদ করলেও বর্তমানে ওই জলাশয় তিনি ২-৩ লাখ টাকা শতক হিসেবে প্লট আকারে বিক্রি করছেন।

সাথে বিএনপির এক নেতাও ওই জলাশয় বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ অনেকের। কিন্তু রেলওয়ের আইডাব্লু সরিফুল ইসলাম ও কানুনগো সাইফুল ইসলাম সব জেনেও নিশ্চুপ। কারন ওই দুই কর্মকর্তা হুমায়ুনের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলেই এ বিষয়ে রেলওয়ের উর্ধতন কর্মকর্তাকে জলাশয় প্লট আকারে বিক্রির ব্যাপারে কোন অভিযোগ করেন নাই।

এ বিষয়ে ৭ নম্বর কাছারি পার্বতীপুর কার্যালয়ের কানুনগো সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এ কর্মস্থলে নতুন। ব্যাপারটি খুব একটা জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে যেসব জলাশয় কৃষি লীজ নিয়ে প্লাট আকার বিক্রি করছে, সেসব একাকায় লাল পতাকা দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কবে লাল পতাকা দিয়ে জলাশয়টি রেলওয়ের আয়ত্তে নেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি কোন দেন নি।

এ বিষয়ে কথা হলে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক ডিএস শাহ সুফি নুর মোহাম্মদ এর সাথে তিনি বলেন, যেদিন বর্তমান সরকারের রেল মন্ত্রনালয় থেকে রেলওয়ের জমি দখল মুক্ত করতে নির্দেশ পাবো, সেদিন থেকে এক মাসের মধ্যে সৈয়দপুরের সকল অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে, উচ্ছেদ করা হবে সকল অবৈধ স্হাপনা। সরকারি জমি ব্যক্তির নামে নামজারি হওয়ার সুযোগ নেই। যদি এ রকম হয়ে থাকে, তবে তা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Ads