ঈদ যাত্রায় দুর্ঘটনা রোধে ত্রিমাত্রিক পরিকল্পনা

জিনিউজবিডি২৪ ডেস্ক ঃ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ৪:৫৩ অপরাহ্ণ
ঈদ যাত্রায় দুর্ঘটনা রোধে ত্রিমাত্রিক পরিকল্পনা

নিত্য দিনের বিচিত্র সব ঘটনার ভিড়ে মাত্র এক মাসে সৌহার্দ পরিবহন আমাদের কাছে আজ স্মৃতি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র আহনাফ রাইয়ানরা নেই; ক’জন তাদের পরিবারের খোঁজ করেছি? সরকার কি পদক্ষেপ নিল; তা পরিষ্কার নয়। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাসের মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি প্রতিবেদন ও দিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা ও প্রতিবেদন দেয়া এটা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাস্তবায়ন কতটুকু হয়? দেশে সড়ক নিরাপত্তার জন্য আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে, রয়েছে নানান ফাঁকফোকর।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী,বাংলাদেশে বছরে ৩১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক ও ক্ষত সৃষ্টি করে না, উপরোন্ত পরিবারটিকে আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে দেয় । পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয়। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বছরে গড়ে বাংলাদেশে জিডিপির ক্ষতি হয় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নেই কোনো গবেষক , কোনো বাজেট বরাদ্দও নেই। এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার গবেষণা ও তথ্য বলতে বিশেষজ্ঞ দ্বারা একক ভাবে করা গবেষণা, বেসরকারি গুটিকয় প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও ডেটাই সম্বল ; এমনকি বিআরটিএ মাত্র ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো দুর্ঘটনা এবং হতাহতের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে ।

প্রতি ঈদে বাংলাদেশের সড়কব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়ে। সরকারি হিসাব বলছে, ঈদ উদ্‌যাপনে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ (দেড় কোটি) মানুষ পরিবারের সাথে ঈদ করতে বাড়ি ফেরেন। এছাড়া সারা দেশে ব্যাপী ৪ কোটি মানুষের চলাচল হয়। আগামী ২৮ মে ঈদুল আজহা অনুষ্টিত হবে; বহু সংকটময়, প্রতিকূল ও বন্ধুর পথে অসংখ্য মানুষ অসম্ভবকে জয় করে ঘরে ফিরবে। হয়তো হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার আবার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তাই ঈদ যাত্রা সহ সারা বছর সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনা কমাতে প্রয়োজন – স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা। স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব। দীর্ঘ মেয়াদি ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি বা তার বেশি হতে পারে। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।আমাদের দেশে ৩ বছর মেয়াদি মধ্যম

পরিকল্পনা দরকার। প্রয়োজনে সরকারি – বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করবে। সে লক্ষে সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়া বাধতামূলক হয়ে গেছে ।

ঈদের আগে ঘরমুখী যাত্রায় ছুটি কম থাকায় একসঙ্গে বহু মানুষের যাত্রার কারণে যানবাহনের ব্যাপক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ বাসের ছাদে, ট্রেনের ছাদে, খোলা ট্রাকে, পিকআপে, ছোট ও স্বল্পগতির নানা প্রকার অনিরাপদ যানবাহনে যাত্রা করেছে। এই অবস্থা ঈদের ফিরতি যাত্রাতেও অব্যাহত ছিল। ঈদ ফিরতি যাত্রা বেশি ঝুঁকিসম্পন্ন। কারণ , বাড়ি যাওয়ার সময় যাত্রাটা কয়েকদিন ধরে চলমান থাকে। যাত্রীদের আর্থিক সংগতিও ভালো থাকে তাই সুবিধাজনক উপায়ে যাত্রা করতে পারে। ফেরার সময় এক/দুই দিনের ব্যাবধানে সকলে একসাথে ফেরে; সেইসাথে থাকেনা আর্থিক সঙ্গতি ; তাই ফিরতিপথে নিম্ন মানের, সস্তা ঝুঁকিপূর্ণ বাহন ব্যবহৃত হয়। স্বভাবতঃই এ সময় দুর্ঘটনা বেশি হয়।

সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নিরাপদ ও জনবান্ধব করার জন্য সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনা দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনার সুপারিশগুলো হচ্ছে—

এই পরিকল্পনার অধীনে রেললাইন সংস্কার এবং সম্প্রসারণ করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে সড়ক পথের মানুষকে ট্রেনমুখী করতে হবে, ট্রেনে ফ্রীজয়িং বগি চালু করা, ক্যান্টিনের ন্যায় মেডিকেল বগি রাখা ; নদীপথ সংস্কার ও জনবান্ধব করা ; মন্ত্রণালয়ে রোড সেফটি গবেষণা উইং প্রতিষ্ঠা করা ; উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ও নির্ভরযোগ্য সড়ক নিরাপত্তা ডাটাবেস গড়ে তুলতে হবে; জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলকে পুনর্গঠন এবং সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন নীতিকে সমন্বিত করতে একটি একীভূত যোগাযোগ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে; দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চক্র ভাঙতে BRTA এর সংস্কার এবং প্রয়োজনে আধুনিক সড়ক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করতে হবে; পর্যায়ক্রমে সবমহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কমিটিগুলোকে সক্রিয় করে স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ; দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোকে একটি আধুনিক মহাপরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা, যেখানে ডিভাইডারযুক্ত লেন, সার্ভিস লেন এবং নিরাপদ ইন্টারসেকশন থাকবে; নৌপথের নাব্যতা ধরে রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করা এবং রাতে চলাচলের জন্য আধুনিক ও দৃশ্যমান বয়া বা সংকেত স্থাপন করা; বিস্ববিদ্যালয়ে রোড সেফটি বিষয়ে পূর্ণ ডিপার্টমেন্ট চালু করা।

দুর্ঘটনা রোধে স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা:

সেবা বাংলাদেহ ফাউন্ডেশন আরো মনে করে, স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে কিছু পরিকল্পনা আমরা নিজেরাই বাস্তবায়ন করতে পারি। এর জন্য সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন

নেই। যেমন – প্রতিটি শিশুর সাঁতার শেখা পরিবারথেকে নিশ্চিত করা ; ব্যাক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঈদ যাত্রা করার সময় গাড়ির ফিটনেস চেক করা লাইফজ্যাকেট, ফাস্ট এইড মেডিকেল এবং জরুরি সরঞ্জাম রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা; পরিবারের সদস্যদের কে অসচতন ভাবে রাস্তাপারের অনুৎসাহী করা ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার নিশ্চিত করা; অনেক সময় ব্যাক্তিগত গাড়ি মালিক নিজেই চালান, কিন্তু দূরযাত্রার ক্ষেত্র্রে তা বিপদজনক তাই পেশাজীবী চালক গাড়ি চালানো নিশ্চিত করা; যানবাহনে তেল /গ্যাস নেয়ার সময় গাড়ি থেকে নামা ; ফেরিতে গাড়ি উঠা ও নামার সময় গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ানো; গাড়ি চলন্ত অবস্থায় চালকের সাথে কথা না বলা; চালকের সাথে বিবাদে লিপ্ত না হওয়া; চালকের বিশ্রাম নিশ্চিত করা ; গণমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক পোস্ট আমরাই দিতে পারি; অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানকে যানবাহন বিশেষত মোটরসাইকেল চালাতে না দেয়া, এই সমস্যার সমাধান পরিবারই পারে করতে; পরিবার থেকেই অবৈধ পার্কিং- হেলমেট ব্যবহার, সিটবেল্ট বাঁধা, বেপরোয়া গতি , সিগন্যাল অমান্যকারী, মোটরসাইকেলে দুইজনের বেশি আরোহী না চড়ার বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলা I এসব কালচার ও অভ্যাস শিশুকাল থেকে গড়ে তুলতে হবে।

সড়কে নির্মাণ, পুননির্মাণ, গ্যাস-পানি সংযোগ স্থাপন, সংস্কার ইত্যাদির কারণে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির বিষয়ে পুনঃবিবেচনা ও নজরদারির ব্যবস্থা রাখা; দুর্ঘটনার পর বাসের নাম, রঙ বদলে করে পুনরায় রাস্তায় নামানো যাবে না; লাইসেন্সবিহীন চালকের শাস্তির ব্যবস্থা করা; পেশাদার চালকদের লাইসেন্স যাচাই করা এবং অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করে রিফ্রেশার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা; চালকরা বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালান বন্ধ করা ; দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে; চালকদের নিয়োগপত্র বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করতে হবে; বিপজ্জনক মোড় ও স্থান চিহ্নিতকরণ; প্রতি ঈদের আগে জাতীয় মহাসড়কে বিশেষ মেরামত ও যানজটপ্রবণ স্থানে অস্থায়ী ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো; মহাসড়কে গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া এবং রাডার গান বা স্পিড ক্যামেরা ব্যবহার করে দ্রুতগতির যানবাহনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা; জিপিএস, নজরদারি ক্যামেরা এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে; ওজন পরিমাপক কেন্দ্র চালু করতে হবে; দুর্ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা বন্ধ করা; ঈদযাত্রায় পোশাক শ্রমিকদের ছুটি একসাথে না দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে সাজানো ও তাদের জন্য অঞ্চলভিত্তিক যানবাহনের ব্যবস্থা করা; ঈদের আগে অতিরিক্ত বাস- ট্রেন-ফেরি চালু, অনলাইন টিকিটিং বাধ্যতামূলক ও অনলাইন টিকিট প্রাপ্তি সহজ লভ্য করা।

সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন আরো সুপারিশ করে চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক রেস্ট পিরিয়ড নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল জিপিএস ট্র্যাকিং চালু; পরিবহনের সাথে জড়িত সকলের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; ভুয়া লাইসেন্স দেওয়া অবিলম্বে বন্ধ করা; সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে পর্যাপ্ত ট্রেইনিংপ্রাপ্ত জনবল নিয়োগ; ফেরিঘাট ও হাইওয়েতে বিশেষ মনিটরিং টিম বসানো পরিবহন চালকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য সার্ভিস রোড তৈরি করতে হবে; রেল ও নৌ-পথ সংস্কার করে সড়ক পথের উপর চাপ কমাতে হবে; গণপরিবহন উন্নত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করে মোটসাইকেল ব্যবহার নিরৎসাহিত করতে হবে; ঈদের আগে-পরে সরকারি ছুটির সঠিকভাবে বিন্যাস করতে হবে; নৌযানে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মালপত্র বোঝাই বন্ধে কঠোর তদারকি করা; প্রতিটি নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, বয়া ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; প্রতিকূল আবহাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা এবং সতর্কবার্তা প্রচার করাI

ঈদের আগে সব নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষা করা এবং ত্রুটিপূর্ণ নৌযান চলাচল বন্ধ করা; নৌ-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক বিশেষ টহল ও দ্রুত উদ্ধার অভিযান টিম প্রস্তুত রাখা; গণমাধ্যমে এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সরকারী /আধাসরকারী / সায়ত্বশাষিত প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে; ঈদ ও উৎসবের সময়ে যাত্রীসেবা ও দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের জন্য সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম স্থাপন; প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরে অত্যাধুনিক উদ্ধারকারী জাহাজ ও ডুবুরি দল প্রস্তুত রাখা; স্কুল গুলোতে রোডসফটি বিষিয়ে পাঠদান করা, এ বিষয়ে সহশিক্ষার ব্যবস্থা করা; সকল স্কুলে সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক করা।

স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োগই এই পরিস্থিতির নীতিবাচক সমাধান দিতে পারে। সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন মনে করে পরিবার, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। ঈদ যাত্রার পূর্বে এবিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

Ads