বিদ্যুৎ গিলছে অটো চার্জার ভ্যান ও রিকশা

আব্দুস সবুর, তানোর প্রতিনিধি (রাজশাহী) ঃ
প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ৪:৫৪ অপরাহ্ণ
বিদ্যুৎ গিলছে অটো চার্জার ভ্যান ও রিকশা

সারা দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে রাজশাহীর তানোরে দিনের দিন ব্যাটারি চালিত চার্জার ভ্যান ও অটো রিকশার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর এসব অটো চার্জার ভ্যান ও রিকশা প্রতিদিন গিলছে বিদ্যুৎ। সহজলভ্য ও কম খরচের এই বাহন একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তা এখন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে এবং বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ চুরির ঝুঁকি।

তবে উপজেলায় অটো রিকশা খুব একটা চোখে না পড়লেও চার্জার ভ্যান ও অটো চার্জার ভ্যানের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এসব চার্জ নির্ভর যানবাহনে প্রায় বাড়িতে দেয়া হয় বিদ্যুৎ চার্জ। যার কারনে লোডশেডিং থেকে শুরু করে সেচ কাজে সঠিক ভাবে বিদ্যুৎ মিলছেন।

গভীর রাতে ব্যাটারিচালিত ভ্যানগুলোতে চার্জ দেওয়া হয় বিভিন্ন স্থানে। আর এর ফলে প্রতিদিন প্রায় শতশত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উধাও হচ্ছে বলে জানা গেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, একটি ব্যাটারিচালিত অটো ভ্যান ও রিকশা চালাতে সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন হয়। প্রতিবার পূর্ণ চার্জ দিতে গড়ে ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ লাগে, যা প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ইউনিট বিদ্যুৎ খরচের সমান। এতে একটি রিকশা টানা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা চলতে পারে।

জানা গেছে, উপজেলায় গ্রামগঞ্জে অটো ভ্যানের ছড়াছড়ি। কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে এধরনের যানবাহন তৈরি হতেই আছে। ইচ্ছে মত তৈরি করা হয় এসব যানগুলো। দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করলেও চার্জার ভ্যান বা অটো চার্জার ভ্যানের কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে ধারণা করা হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন শুধু প্রায় ৪০/৬০ রিকশায় চার্জ দিতে জাতীয় গ্রিড থেকে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হওয়ার কথা। অথচ চার্জার ভ্যান উপজেলা পর্যায়ে হিসেব করলে আরো কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু ৪০ থেকে ৬০ লাখ রিকশায় তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গিললে চার্জার ভ্যানেও সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর বড় একটি অংশই বৈধভাবে হিসাবভুক্ত হচ্ছে না। প্রায় ৮০ শতাংশ গ্যারেজে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে এসব রিকশা চার্জ দেওয়া হয়, ফলে সরকার প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের রাজস্ব হারাচ্ছে। আবার বাড়িতে আবাসিক সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দিচ্ছে গ্রামের চালকরা।

মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, অধিকাংশ চালক গ্যারেজ ও বাসা বাড়িতে রাতভর রিকশা বা ভ্যান রেখে চার্জ করান। এ জন্য গ্যারেজ মালিককে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দিতে হয়। এসব চার্জিং পয়েন্টের বেশিরভাগই অনুমোদনহীন এবং অনিয়ন্ত্রিত, যেখানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ আসে অবৈধ লাইনের মাধ্যমে। এতে বিপণন সংস্থাগুলো বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে অভিযান চালালেও গ্যারেজ মালিকদের নানা কৌশলে তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কিছু এলাকায় আলাদা ট্যারিফ চালু করা হয়েছে, যার আওতায় সীমিতসংখ্যক রিকশা বৈধভাবে বিদ্যুৎ নিচ্ছে।

বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড এমনিতেই চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশার অতিরিক্ত চার্জিং চাহিদা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যখন বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ে, তখন এসব রিকশা চার্জিং লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০ ধরনের যানবাহনের নিবন্ধন দিলেও ব্যাটারিচালিত ভ্যান, রিকশার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬২ লাখ, যার মধ্যে বাস-মিনিবাস মাত্র ৮৪ হাজার। তিন চাকার যানবাহনের মধ্যে শুধু অটোরিকশা ও অটোটেম্পোর নিবন্ধন দেওয়া হয়, যার বৈধ সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৪২ হাজার।

অন্যদিকে নিবন্ধনের বাইরে ৬০ থেকে ৭০ লাখ ছোট তিন চাকার যান চলাচল করছে, যেগুলোকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও রিকশার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা একটি পরিবারের জীবিকার উৎস। একজন চালকের পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা পাঁচজন ধরলে প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবনযাপন এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া রিকশা মেরামত, ব্যাটারি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট কারখানায়ও বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

গ্রামীণ এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই বাহন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, শুরুতেই এসব তিন চাকার যান নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পরিস্থিতি ভালো থাকত। এখন বিপুলসংখ্যক ত্রুটিপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত যান সড়কে চলাচল করছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করে সঠিক নীতিমালা, নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রিত চার্জিং স্টেশন চালু করা জরুরি। তা না হলে বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি— দুটোই ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

Ads