নাটোরে তিন দিনব্যাপী

২৫ জাতের আম ও ৩৭ প্রজাতির দেশীয় ফলের সমাহার, ফল মেলা

মোল্লা মো: আরিফুল ইসলাম, নাটোর প্রতিনিধি ঃ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৩:০২ অপরাহ্ণ
২৫ জাতের আম ও ৩৭ প্রজাতির দেশীয় ফলের সমাহার, ফল মেলা

দেশীয় ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নতুন প্রজন্মকে দেশীয় ফলের সঙ্গে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্যে নাটোরে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আম প্রদর্শনী ও ফল মেলা। নানা জাতের আম, বিরল ও অপ্রচলিত ফল, ফলজ গাছের চারা এবং ভেষজ পণ্যের সমাহারে মেলাটি পরিণত হয়েছে কৃষক, উদ্যোক্তা ও সাধারণ দর্শনার্থীদের মিলনমেলায়।

“করবো মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করবো বারো মাস” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় নাটোর শহরের কানাইখালী মিনি স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। উদ্বোধনের পর তিনি বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং প্রদর্শিত ফল, চারা ও কৃষিপণ্য সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মানুষের সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবন গঠনে ফলের ভূমিকা অপরিসীম। ফল শুধু সুস্বাদু খাদ্য নয়, বরং এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও খাদ্যআঁশের অন্যতম প্রধান উৎস। নিয়মিত ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং অপুষ্টি দূর হয়। তাই পরিবারভিত্তিক ফল চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাড়ির আঙিনা, ছাদ এবং পতিত জমিতে ফলজ গাছ রোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।

বক্তারা আরও বলেন, দেশে ফল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এলেও সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফল সংগ্রহের পর অপচয় রোধ, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় ফলের উৎপাদন ও সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি এবং অপ্রচলিত ফলের বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।

জেলা প্রশাসক আসমা শাহীনের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নাটোর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আবুল হায়াত, আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট খন্দকার মাহবুব এবং জেলার সফল ফলচাষি আল আমিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) শামসুন্নাহার ভূঁইয়া।

মেলায় অংশ নেওয়া ১১টি স্টলে ১৪ ধরনের প্রচলিত দেশীয় ফল, ২৩ ধরনের অপ্রচলিত ফল এবং ২৫ জাতের আম প্রদর্শন করা হচ্ছে। আমের বিভিন্ন জাতের মধ্যে রয়েছে দেশের জনপ্রিয় ও উচ্চফলনশীল জাতসমূহ। এছাড়া মাল্টা, ড্রাগন, অ্যাভোকাডো, বারোমাসি ফলসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় ফলও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

মেলার একটি বিশেষ আকর্ষণ নাটোরের ঐতিহ্যবাহী ভেষজ পল্লীর স্টল। সেখানে বিভিন্ন ভেষজ গাছ, ঔষধি উপাদান ও স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফলজ গাছের উন্নতমানের চারাও বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা ফল চাষে আগ্রহীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নাটোর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, “নাটোর কৃষি সমৃদ্ধ একটি জেলা। আমসহ বিভিন্ন ফলের উৎপাদনে এ জেলার কৃষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এই ফল মেলার মাধ্যমে কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন জাত ও ফল উৎপাদনের কৌশল সম্পর্কে জানতে পারবেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ দেশীয় ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতন হবেন।

তিনি আরও বলেন, “ফল চাষ শুধু পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে না, এটি কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষি বিভাগ নিরাপদ ও লাভজনক ফল উৎপাদনে কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই প্রতিটি পরিবার অন্তত কিছু ফলজ গাছ রোপণ করুক এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।

মেলায় আগত দর্শনার্থী সোহেল রানা,রাসেল আহমেদ ও শিখা রানী জানান, একসঙ্গে এত ধরনের দেশীয় ও অপ্রচলিত ফল দেখার সুযোগ খুব কমই পাওয়া যায়। ফলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেশীয় ফল সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই বিভিন্ন ফলজ গাছের চারা কিনে বাড়িতে রোপণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

আয়োজকরা আশা করছেন, এই ফল মেলা শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়; বরং এটি ফলভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ, পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী তিন দিন প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মেলা সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ফলপ্রেমী মানুষ, কৃষক ও উদ্যোক্তাদের পদচারণায় মেলাপ্রাঙ্গণ মুখর হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

Ads