৩ কোটি টাকার খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ: পিআইওর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

মিরাজুল ইসলাম, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি কুষ্টিয়া ঃ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
৩ কোটি টাকার খাল খননে অনিয়মের অভিযোগ: পিআইওর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার জানিপুর ও শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৯ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন প্রকল্পকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান এবং কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া প্রায় ৩ কোটি ৯ লাখ টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে খোকসা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. দোস্তদার হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

এছাড়াও ৯ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন প্রকল্প কে মন্দের ভালো এবং আশপাশের জেলা থেকে ভালো হয়েছে বলে স্বীকারোক্তি দেন খোকসা উপজেলা নিবার্হী অফিসার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে নীতিমালা মানা হয়নি, শ্রমিকের সংখ্যা কাগজে-কলমে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, অধিকাংশ কাজ শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু মেশিন দিয়ে করা হয়েছে এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। তাদের দাবি, এসব অনিয়মের কার্যকর তদারকি করতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা পিআইও।

প্রধানমন্ত্রীর এই মহান উদ্দেশ্য কে ওরা প্রশ্ন বিদ্ধ করতে পরিকল্পিত ভাবে বিতর্কিত করছে বলে মন্তব্য স্থানীয়দের।

খোকসা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) আওতায় জানিপুর ও শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৯ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য ৩ কোটি ৯ লাখ ২ হাজার ৪৭০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৪ এপ্রিল কাজ শুরু হয়ে ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে ৭১৪ জন শ্রমিকের নাম দেখানো হলেও বাস্তবে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করেননি। স্থানীয়দের দাবি, তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নামও রয়েছে যারা কখনো কাজে অংশ নেননি। এমনকি প্রবাসী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী ৬০ শতাংশ কাজ শ্রমিক দিয়ে এবং ৪০ শতাংশ কাজ খননযন্ত্রের মাধ্যমে করার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ অংশ ভেকু মেশিন দিয়ে খনন করা হয়েছে। অনেক স্থানে খাল পুনঃখননের কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভেকু দিয়ে কাটা মাটি খালের পাড়ে না রেখে মানুষের বসতবাড়ি ও গ্রামীণ চলাচলের রাস্তার ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। এতে বহু রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজেদের অর্থ ব্যয়ে রাস্তা সংস্কার করতে হচ্ছে।

প্রকল্পে পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ৫ থেকে ৬ ফুট উচ্চতার উন্নতমানের গাছ লাগানোর কথা থাকলেও বাস্তবে ২ থেকে ৩ ফুট উচ্চতার নিম্নমানের চারা বিভিন্ন স্থান থেকে বিনামূল্যে এনে রোপণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক স্থানে কোনো গাছই লাগানো হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিকদের মজুরি ব্যাংক হিসাবে জমা হলেও শিমুলিয়া ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য শ্রমিকদের কাছ থেকে স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেক নিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেছেন। এ অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নারী শ্রমিক জানান, আমরা শুধু ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করে দিয়েছি। যে কয়দিন কাজ করেছি সে কয় দিনের টাকা পাইছি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কোন রকমে খালের পাড় ঠিক করেছে। অধিকাংশ জায়গায় গভীর করে খনন করা হয়নি। আমাদের বাড়ি ঘরের সামনে মাটি ফেলে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই মহান উদ্দেশ্য কে ওরা প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে। অভিযোগ দেবো কোথায়। বড় বড় স্যার রা এ অনিয়মের সাথে জড়িত।

প্রকল্পের পিআইসি কমিটির সভাপতি ও শিমুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, আমাকে প্রকল্পের বিষয়ে শুরুতে কিছুই জানানো হয়নি। পরে শুধু স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। প্রকল্পের সার্বিক বিষয় রাজ্জাক মেম্বার দেখেছেন।

এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আব্দুর রাজ্জাকের কাছে শ্রমিকদের তালিকার বিষয়ে কথা বললে তিনি জানান, আপনারা খোকসা উপজেলার পিআইও অফিসের আলিমের সাথে কথা বলেন সে সবার সাথে সমন্বয় করছে।

খোকসা উপজেলা পিআইও অফিসের আলিমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বিভিন্ন ভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি সহ বিভিন্ন মহলদের তদবির ও সুপারিশ শুরু করেন তিনি।

অভিযোগ প্রসঙ্গে খোকসা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. দোস্তদার হোসেন বলেন, আমরা নিয়ম অনুযায়ী আমাদের কাজ করছি। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।

খোকসা উপজেলার নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, বগুড়া এবং অন্যান্য জেলার নিউজ হয়েছে সেগুলো কি আপনারা দেখেছেন সে তুলনায় আমাদের এখানে কাজ অনেক ভালো হয়েছে। এক কথায় বলতে পারেন খারাপের মধ্যে ভালো।

খোকসা খাল খননের বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মুহাম্মদ রিজিবুল ইসলাম বলেন , এধরনের কোন অভিযোগ আসলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

এই বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, একই প্রকল্পে এতগুলো অভিযোগ ওঠার পর শুধু মৌখিক অস্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

Ads