আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন যেভাবে আটক হলেন

reporter
গাজী যুবায়ের আলম, ব্যুরো প্রধান খুলনা ঃ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ণ
আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন যেভাবে আটক হলেন

বহুল আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতির দাবি করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।

মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে যশোরে বিশেষ অভিযান চালিয়ে আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

একই অভিযানে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি, গুলি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এই অভিযান শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তেই নয়, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রের কার্যক্রম উন্মোচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আজ বৃহস্পতিবার ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। তিনি বলেন, গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় সংঘটিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলাটি শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছিল। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়।

পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, অবস্থানগত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে একে একে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ২২ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে দুই দিনের রিমান্ডে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ধামা ইলিয়াছ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের মজুদ, সহযোগীদের অবস্থান, যোগাযোগের কৌশল এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

সেই তথ্য যাচাই-বাছাই করে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ যশোর জেলা পুলিশের সহযোগিতায় একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে। দীর্ঘ নজরদারির পর যশোর জেলার কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন (২৫) আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫) মো. শামীম (২৮) মোঃ সাফায়েত হোসেন (২৪) এবং আরও একজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং অন্যান্য অস্ত্র।

পুলিশ জানায়, ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে সিএমপি ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে।

এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিল ডেভিড ইমন।

বিভিন্ন সময়ে এই গ্রুপের হয়ে মাঠপর্যায়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রের মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পুলিশ বলছে, বড় সাজ্জাদ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পরও তার সহযোগীদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা চলছিল। সেই নেটওয়ার্কের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে ডেভিড ইমনের নাম তদন্তে উঠে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমন অস্ত্র ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিল বলে ধারণা করা হয়। তদন্তে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে যে, বিভিন্ন সময়ে আধুনিক অস্ত্র হাতে তার একাধিক ছবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দীর্ঘদিন ধরেই তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।

অবশেষে প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা নজরদারির সমন্বয়ে যশোরে তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সংঘটিত আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় প্রথমবার আলোচনায় আসে ডেভিড ইমনের নাম। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া হত্যা মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়।

একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাতেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাসহ আরও কয়েকটি ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

একসময় চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে সম্ভাবনাময় বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে পরিচিত ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন। স্থানীয় পর্যায়ে ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি ক্রিকেটপ্রেমীদের নজরে আসেন। ২০১৯ সালে ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে নিয়মিত অনুশীলন করতেন।

বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউড়ি এলাকায় নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে খেলার স্বপ্নও ছিল তার। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের বোলিং অনুসরণ করে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করতেন।

তবে করোনাকালের পর ধীরে ধীরে ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যান। পরবর্তী সময়ে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ আমিনুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ইমন শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। নিয়মিত অনুশীলন করত এবং ক্রিকেট নিয়েই তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু একসময় সে অনুশীলনে আসা বন্ধ করে দেয়। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘ডেভিড ইমন’ নামে তার পরিচয় সামনে আসার পর বিষয়টি জানতে পারেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, একটি হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। এসব অস্ত্র অন্য কোনো অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অর্থের উৎস, অস্ত্র সংগ্রহের পথ, আশ্রয়দাতা এবং সহযোগীদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও মহানগর পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে। প্রয়োজন হলে অন্যান্য মামলার তদন্তের সঙ্গেও এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই গ্রেপ্তার অভিযানের ফলে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পলাতক অন্যান্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কাজও জোরদার করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চলমান থাকবে এবং কোনো অপরাধীকে আইনের আওতার বাইরে থাকতে দেওয়া হবে না।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান মামলাগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়া হবে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Ads