ঘনঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ রংপুরবাসী, বেড়েছে হাতপাখার কদর

তারিকুল ইসলাম শুভ, রংপুর প্রতিনিধি ঃ
প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২০ অপরাহ্ণ
ঘনঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ রংপুরবাসী, বেড়েছে হাতপাখার কদর

তীব্র গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার মধ্যে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে রংপুরের জনজীবন। দিনে যেমন বিদ্যুতের ভোগান্তি, তেমনি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। বিদ্যুৎ চলে গেলেই ঘরে-বাইরে অসহনীয় গরম। ফলে আধুনিক বৈদ্যুতিক ফ্যান, আইপিএস কিংবা সোলারের বিকল্প হিসেবে আবারও মানুষের ভরসা হয়ে উঠেছে সেই চিরচেনা হাতপাখা।

বুধবার(১২আগাস্ট ) দুপুরে নগরীর কাচারী বাজার এলাকায় হাত পাখার দোকানে গিয়ে দেখা যায় এ চিত্র । তবে এই হাতপাখার চাহিদা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।দামও অনেক বেশি।আগে ৫০-৬০ টাকায় যে পাখা বিক্রয় হতে সেই হাতপাখা এখন ৯০-১০০ টাকা বিক্রয় করছে ব্যবসায়ীরা।

বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হাতপাখার চাহিদা।রংপুর নগরের কাচারী বাজারসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, হাতপাখার দোকানগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। তালপাতা, বাঁশ, কাপড় ও প্লাস্টিকের তৈরি নানা ধরনের হাতপাখা বিক্রি হচ্ছে। আকার, নকশা ও মানভেদে প্রতিটি পাখার দাম ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। বিক্রেতাদের দাবি, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন হাতপাখার বিক্রি অনেক বেড়েছে। চাহিদা বাড়ায় পাইকারি বাজারেও দাম বেড়েছে। ফলে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।

হাতপাখা কিনতে আসা আমানত আলী বলেন,কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের অবস্থা খুব খারাপ। দিনে-রাতে মিলিয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। দিনে কোনোভাবে সময় কাটানো গেলেও রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষায়, ‘আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টাই থাকে না।’ এর মধ্যে ভ্যাপসা গরম। বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে তিনি ১২০ টাকা দিয়ে দুটি তালপাতার হাতপাখা কিনেছেন।

গৃহবধূ খাতিজা সুলতানা বলেন, দিনের পাশাপাশি রাতেও লোডশেডিং হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশুরা গরমে ঘেমে যায়, ঘুমাতে পারে না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সোলার বা আইপিএস কেনার সামর্থ্য নেই। তাই এখন হাতপাখাই তাঁদের ভরসা। তিনি ৭০ টাকা করে দুটি হাতপাখা কিনেছেন। প্রয়োজনের সময় দাম একটু বেশি হলেও করার কিছু নেই বলে জানান তিনি।

মুদি দোকানি সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকানের ভেতর গরম বেড়ে যায়। সেখানে বসে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই ৮০ টাকা দিয়ে একটি হাতপাখা কিনেছেন। তাঁর মতে, ঘনঘন লোডশেডিং ও ভ্যাপসা গরমে ছোট-বড় সবাই কষ্ট পাচ্ছেন।

কাচারী বাজার এলাকার হাতপাখা বিক্রেতারা বাপ্পি মিয়া জানান, সাধারণত গরমের মৌসুমে হাতপাখার চাহিদা বাড়ে। তবে এবার তীব্র গরমের সঙ্গে ঘনঘন লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় বিক্রি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গ্রামের কারিগরদের কাছ থেকে তাঁরা পাইকারি দামে হাতপাখা কিনে এনে শহরে বিক্রি করেন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাঁদেরও বেশি দামে পাখা কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে দাম কিছুটা বেড়েছে। তাঁদের দাবি, কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো পাখার দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

রংপুর জুম্মাপাড়া এলাকা তাজুল ইসলাম তাজ বলেন-প্রতিদিন সকাল থেকে ৫-৬ বার বিদ্যুৎ আসা যাওয়া করছে। একঘন্টা থাকলেও ৫ ঘন্টা থাকছে না।এর ফলে মানুষ হাতপাখা ব্যবহার করছে।

শিক্ষীথীরা নয়ন মিয়া বলছেন সঠিক ভাবে লেখাপড়া করতে পারছি না। বিদ্যুৎ ঠিক ভাবে থাকছে না।

রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু বাসাবাড়িই নয়, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র শিল্পেও ভোগান্তি বাড়ছে। বিশেষ করে দুপুর ও রাতের দিকে গরমের তীব্রতা অনুভূত হচ্ছে বেশি। বিদ্যুৎ চলে গেলে বৈদ্যুতিক পাখা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত অসহনীয় হয়ে ওঠে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই বিকল্প হিসেবে আইপিএস, ইউপিএস বা সোলার ব্যবস্থা করতে না পারায় হাতপাখাই তাঁদের সহজলভ্য সমাধান।

গরমের সঙ্গে বিদ্যুৎ না থাকার এই সংকট শিশুদের জন্যও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অভিভাবকেরা বলছেন, রাতে লোডশেডিং হলে শিশুরা ঘুমাতে পারে না। ঘামে ভিজে যায় বিছানা ও পোশাক। অনেকে ঘরের দরজা-জানালা খুলে দিলেও গরমের স্বস্তি মিলছে না। ফলে একদিকে গরম, অন্যদিকে মশার উপদ্রব দুই মিলিয়ে রাত কাটছে দুর্ভোগে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ার কথা বলা হয়েছে।তবে বৃষ্টি না হওয়া সময়টুকুতে ভ্যাপসা গরম ও আর্দ্রতার কারণে অস্বস্তি বাড়তে পারে। রংপুরেও গরমের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি মানুষের দুর্ভোগকে আরও তীব্র করছে।

এদিকে বিদ্যুৎসরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, দিনের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পাশাপাশি রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা,ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা এবং বাসাবাড়ির দৈনন্দিন কাজেও এর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে রাতের লোডশেডিং মানুষের ঘুম ও বিশ্রামে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে বহু পুরোনো হাতপাখা যেন নতুন করে ফিরে এসেছে রংপুরের মানুষের জীবনে। একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে থাকা তালপাতা ও বাঁশের হাতপাখা এখন শহরের বাজারেও বেশ কদর পাচ্ছে।বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা যত বাড়ছে, লোডশেডিংয়ের সময় ততই প্রয়োজন হচ্ছে বিকল্প বাতাসের। সেই প্রয়োজন মেটাতেই বাড়ছে হাতপাখার বিক্রি।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, হাতপাখা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিংয়ের স্থায়ী সমাধান নয়। গরমের এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানান বুধবার রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা,রেকড করা হয়েছে-৩৪ দশমিক ১ ডিগ্রী সেসিয়াস।আগামী ১৫ তারিখ পযন্ত গরম থাকবে।তবে ১৬ তারিখে বৃষ্টি হওয়ার আশংকা করছেন আবওহা অফিস।

রংপুর নেসক্স প্রধান প্রকৌশলী মো:আশরাফুল ইসলাম মন্ডল জানান রংপুরে বিদ্যুৎ এর চাহিদা ৭০-৭৫ মেগ্ওয়াড কিন্ত ‍আজ পা্ওয়া গেছে ৫০ মেগওয়াড বিদ্যুৎ।এর ফলে একটু লোডসেডিং হচ্ছে।তবে অতিদ্রুত এর সমস্যার সমাধান হবে।

Ads