বদনাম ঢাকতে হাসপাতালের নাম বদল অভিযানের জরিমানায় ফের হল বদনাম

সাগর আহম্মেদ, কালিয়াকৈর প্রতিনিধি(গাজীপুর)ঃ
প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ৮:১০ অপরাহ্ণ
বদনাম ঢাকতে হাসপাতালের নাম বদল অভিযানের জরিমানায় ফের হল বদনাম

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম, ভুল চিকিৎসা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিসহ নানা বদনাম ঢাকতে নাম বদল করে অবৈধভাবে নতুন রূপে ফিরলো একটি হাসপাতাল। অবৈধভাবে কার্যক্রম চালানোসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে বুধবার দুপুরে ওই হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মুহুর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে উঠে ওই হাসপাতালের সেই পুরোনো বদনাম। তবে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশেই অভিযানে বন্ধ হওয়া হাসপাতালটি ফের চালু হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন আগে কালিয়াকৈর উপজেলার সাহেববাজার বাইপাস এলাকায় গড়ে উঠে দেওয়ান ডিজিটাল হাসপাতাল এন্ড ডায়গনষ্টিক সেন্টার। এরপর থেকে স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম, ভুল চিকিৎসা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিসহ নানা বদনামের মাধ্যমে ওই হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক আমিনুর দেওয়ান।

ওই হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্স স্বল্পতা এবং নার্সদের কোনো প্রাথষ্ঠানিক ডিগ্রিও নাই। অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার আশায় তিনি এভাবেই হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। সেখানে ভুল চিকিৎসায় কখনো কখনো রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। আর আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থসহ নানাভাবে হয়রানীর শিকার হন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

সে অনুযায়ী গত ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে ওই হাসপাতালে ভুল অপারেশনে এক প্রসুতি মায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গত ২০২২ সালের আগস্ট মাসে ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে আল্ট্রাসোনোগ্রামের নামে সিজারিয়ান অপারেশনে নবজাতক হত্যার অভিযোগ উঠে। এমন নানা ঘটনায় বিভিন্ন সময় গাজীপুর সিভিল সাজন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা অভিযান চালালেও তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।

সবশেষ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ভুল চিকিৎসায় অপর এক প্রসুতি মায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সে সময় বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক ভাইরাল হয়ে উঠে। এ ঘটনার পর ওই বছরের ১৮ নভেম্বর বিশেষ অভিযান চালিয়ে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। এরপরও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজসে চুপিসারে হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন মালিক আমিনুর। কিন্তু ভুল তথ্য দিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করায় সরকারের রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় মামলা হলে তিনি কিছুটা বিপাকে পড়েন।

এরপর ২০২৬ সালে বদনাম ঢাকতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজসে কৌশলে ওই হাসপাতালের নাম রাখা হয় কালিয়াকৈর জেনারেল এন্ড ট্রমা সেন্টার। এরপর থেকে তিনজনের পাটনারসীপে নতুন রূপে ফিরলেও অতিরিক্ত অর্থের লোভে নিয়মনীতির তুয়াক্কা না করে পুরোনো কায়দায় অবৈধভাবে চলছে হাসপাতালটি। এমন সংবাদের ভিত্তিতে ওই হাসপাতালে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুন নাহার শিলা।

এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাদিয়া আক্তার মুনমুন, পুলিশসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অভিযান চালিয়ে বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ওই হাসপাতালকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়াও ওই হাসপাতালে রয়েছে চিকিৎসক ও নার্সের স্বল্পতা। কিন্তু নার্স ও বিভিন্ন টেস্ট যারা করেন, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিও নেই।

এছাড়াও তারা সরকারী হাসপাতালের নামে রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছে বিব্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগের সত্যতা পান ভ্রাম্যমান আদালত। এসব কারণে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও পরিবেশ উন্নত না করলে হাসপাতালটি পুরোপুরো সিলগালা করে দেওয়ার চরম সর্তকতা ও নির্দেশ জারি করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এদিকে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করায় ওই হাসপাতালের সেই পুরোনো বদনাম মুহুর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে উঠে। তবে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশেই অভিযানে বন্ধ হওয়া হাসপাতালটি ফের চালু হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে ওই হাসপাতালের মালিক আমিনুর দেওয়ান জানান, সম্প্রতি হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছি। সে বিষয়ে আজকে তদন্তে আসার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। হাসপাতালের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আগে অনেক বদনাম ছিল, তথ্য গোপন করায় মামলা করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। এসব কারণে নাম পরিবর্তন করে নতুন রূপে হাসপাতালটি শুরু করছি। তবে সকলের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুন নাহার শিলা বলেন, পূর্বের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামে হাসপাতালটির কার্যক্রম চলমান। তারা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলেও এখনো তারা লাইসেন্সটি পায়নি। বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় জমিরানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়াও নানা অনিয়মের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। যদি এর ব্যক্তয় ঘটে পরবর্তীতে কঠোর ব্যবস্থা নিবো। তবে আমাদের এ ধরণের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

 

Ads