গণভোটে হ্যাঁ বাস্তবায়ন করতে হবে : মিয়া গোলাম পরওয়ার

গাজী যুবায়ের আলম, ব্যুরো প্রধান খুলনা ঃ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৫ অপরাহ্ণ
গণভোটে হ্যাঁ বাস্তবায়ন করতে হবে : মিয়া গোলাম পরওয়ার

গণভোটে হ্যাঁ বললে পুরো রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

তা কেবল সরকার বা রাজনৈতিক দলের হাতে ছেড়ে না দিয়ে তরুণদেরও এর পাহারাদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি জনাব মিয়া গোলাম পরওয়ার।

একই সঙ্গে গণভোটের রায়কে খণ্ডিতভাবে গ্রহণের সুযোগ নেই দাবি করে তিনি বলেছেন, হ্যাঁ ভোট দেওয়া হয়ে থাকলে গণভোটের পুরো রায়ই বাস্তবায়ন করতে হবে। নিজের দেওয়া ভোটের একটি অংশ মেনে অন্য অংশ অস্বীকার করা যায় না।

আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আজ শুক্রবার ১৪ আগস্ট সকালে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর যুব ও ক্রীড়া বিভাগের উদ্যোগে খুলনা প্রেসক্লাবের লিয়াকত আলী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত যুব সম্মেলন-২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

যদিও তরুণদের জীবন ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় বাস্তবতায় গঠিত, তাদের আকাঙ্ক্ষা একই—মর্যাদা, সুযোগ, অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ, মানসম্মত কাজ, মানসম্মত শিক্ষা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খুলনা মহানগরীর যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সভাপতি মুকাররম আনসারীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি।

কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা মহানগরী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এমপি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যুব ও ক্রীড়া বিভাগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর সভাপতি মো. রাকিব হাসান।

খুলনা মহানগরী যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সেক্রেটারি মো. হামিদুল ইসলাম খানের পরিচালনায় বক্তৃতা করেন খালিশপুর থানার মো. মানজারুল ইসলাম, সোনাডাঙ্গা থানার মুরতাজা বিল্লাহ, দৌলতপুর থানার ফজলে রাব্বী, লবণচরা থানার মো. ইউসুফ,হরিণটানা থানার মো. রফিকুল ইসলাম, খুলনা সদর থানার মো. বেলালুজ্জামান, আড়ংঘাটা থানার মো. জালাল, মেজবাহ আল রাফি প্রমুখ।

পরে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শুরু হয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফেরিঘাট মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, একই মায়ের পেটে জন্ম নেওয়া যমজ দুই সন্তানের একজনকে স্বীকার করে আরেকজনকে অস্বীকার করার মতো ঘটনা ঘটছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ফলের মধ্যে একটিকে গ্রহণ করে আরেকটিকে অস্বীকার করা যায় না।

গণভোটে হ্যাঁ ভোটের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির সমালোচনা করে সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বিএনপির নেতারা জুলাই সনদ মানার কথা বলছেন। তবে গণভোটের রায় পুরোপুরি বাস্তবায়নের বিষয়ে তাঁদের স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।

তাঁর দাবি, গণভোটের রায়ের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক পদে নিয়োগ এবং সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নতুন বাংলাদেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, লুটপাট, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও ভিন্নমতের ওপর হামলার কোনো স্থান নেই।

ক্ষমতায় গিয়ে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়াও রাজনীতির একটি বড় ব্যাধি। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে চাঁদাবাজি, মস্তানি, লুটপাট ও মাদকের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব সিন্ডিকেট ভাঙতে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। খুলনার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রতিরোধের প্রশংসা করে তিনি বলেন।

তরুণরা মাদকবিরোধী মিছিল-র‌্যালি করছে, পুলিশকে সহযোগিতা করছে। কোথাও কোথাও মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দও করছে। এ ধরনের উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের সমালোচনা করে সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, এসব অপরাধ সমাজদেহে ক্যান্সারের মতো বাসা বেঁধেছে। রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসও সমাজের বড় ব্যাধি। তরুণদের নেতৃত্বে এসবের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার থেকে তরুণদের দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মোবাইল ফোন বা প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয়। পড়াশোনা, তথ্য অনুসন্ধান ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর ভালো ব্যবহার রয়েছে। তবে অনৈতিক কনটেন্টে আসক্তি তরুণদের চরিত্র ধ্বংস করতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে ছাত্রদলের সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা ও সংঘাতে জড়াচ্ছেন। কোথাও ইসলামী ছাত্রশিবির আগে হামলা করেনি; আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিরোধ করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ছাত্রলীগের পরিবর্তে ছাত্রদল যদি একই ধরনের দখলদারি ও হামলার রাজনীতি করে, তাহলে শুধু দলের নাম বদলাবে, চরিত্র বদলাবে না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এমন বাংলাদেশ কেউ চায়নি।

সরকারি বিভিন্ন পদে দলীয় লোক নিয়োগের অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারি, টেন্ডার ও অর্থ ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

খুলনা বিভাগে জামায়াতের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত এমপিদের নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে হবে। দলীয় পরিচয়ের কারণে অন্য কেউ জনপ্রতিনিধিদের কাজে খবরদারি করতে পারেন না।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আগের দল ভাবত দেশটা তাদের বাপের। এখন দেশটা কার? দেশটা সবার। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে না।

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও সম্মেলনে নিজেদের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনা মহানগর জামায়াতের আমীর মাহফুজুর রহমানকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী দিয়ে জয়ী হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের।

পাড়া-মহল্লায় যুব কমিটি গড়ে তুলে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যত যুবক, তত কমিটি’—এই ধারণায় তরুণদের সংগঠিত করতে হবে। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এক জায়গায় বসে কন্ট্রাক্টরি, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট ভাগ করে নেব না। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের হাত থেকে খুলনা সিটিকে মুক্ত করে পরিচ্ছন্ন সিটি করপোরেশন গঠন করতে চাই।

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, আনাস, মেহেদী হাসানসহ অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল।

হাজার হাজার মানুষের রক্ত ও আহত-পঙ্গুদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তন যদি আবার দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দমন-পীড়নে ফিরে যায়, তাহলে সেই আত্মত্যাগের মূল্য দেওয়া হবে না।

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোরআন পড়তে হবে, চরিত্র গঠন করতে হবে, আল্লাহকে ভয় করতে হবে এবং অনৈতিকতা ও পাপাচার থেকে দূরে থাকতে হবে। মানুষের সমাজ শতভাগ অপরাধমুক্ত হবে না।

কেউ ভুল করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। সংগঠনের কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

Ads