খুলনায় মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ২ যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা: আট দিনে পাঁচ খুন

গাজী যুবায়ের আলম, ব্যুরো প্রধান খুলনা ঃ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪১ অপরাহ্ণ
খুলনায় মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ২ যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা: আট দিনে পাঁচ খুন

খুলনা লবনচরা মাত্র তিন ঘন্টার ব্যবধানে মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) ও নাজমুল (১৮) নামের দুই যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর লবণচরা থানাধীন আশিবিঘা কালভার্ট সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতের মধ্যে মঞ্জুরুল ইসলামকে (১৮) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সে আশিবিঘা কালভার্ট এলাকার খোকন সানার ছেলে ও সেন্টারিং মিস্ত্রির কাজ করতো।

এছাড়া গত ৮ দিনের ব্যবধানে খুলনায় পাঁচ জনের খুন ও এক জন গুলিবিদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই দুর্বৃত্তরা নাজমুল ইসলাম (১৮) নামের আরেক যুবককে গুলি করে হত্যা করেছে। নাজমুলের বাবার নাম মনির শেখ। তিন ঘণ্টা ব্যবধানে দুই জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় খুলনা নগরে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ১৫-২০ জন দুর্বৃত্ত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মনজুরুলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে।

পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত মঞ্জুরুল ইসলাম ওই এলাকার বাসিন্দা খোকনের ছেলে। তিনি পেশায় স্যানিটারি মিস্ত্রি ছিলেন। স্বজনদের দাবি, মঞ্জুরুলের সঙ্গে কারও কোনো পূর্বশত্র“তা ছিল না। এলাকায় ভালো ছেলে হিসেবেই তার পরিচিতি ছিল।

স্বজনরা জানান, মঞ্জুরুল আগে পড়াশোনা করতেন। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে বাবার সঙ্গে স্যানিটারি কাজ করতেন। বুধবার তিনি কাজে যাননি। সন্ধ্যায় এলাকায় অবস্থানকালে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়।

মঞ্জুরুলের বাবা খোকন ছেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এসময় স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এদিকে, মঞ্জুরুল ইসলামকে গুলি করার কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় ১৮ বছর বয়সি নাজমুলকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। নাজমুলের বাবা মনির শেখ। তবে কী কারণে এবং কারা তাকে গুলি করেছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, লবনচরা থানার শিশু বাগান এলাকায় মনির হোসেনের ছেলে নাজমুলের রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশাররফ হোসেন বলেন, হত্যাকান্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। আমরা দ্রুত আসামিদের ধরতে তৎপর রয়েছি।

একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুই যুবক গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থল ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

লবণচরা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সৈয়দ মোশাররফ হোসেন বলেন, একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই যুবক গুলিতে নিহত হয়েছেন। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। হত্যাকান্ডের কারণ এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।

লবণচরা থানার ওসি সৈয়দ মোশাররফ হোসেন বলেন, আশিবিঘা এলাকার একটি ফাঁকা মাঠে ফুটবল খেলা হয়। সেখানে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।

খুলনা সদর থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন।

লবণচরা এলাকা থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একজনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অপরজনের লাশ সিআইডির টিম এলে সুরতহাল পর ময়নাতদন্তের জন্য খুমেকে পাঠানো হয়েছে।

যারা হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনা শহরে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে।

অবিলম্বে খুলনাকে সন্ত্রাস কবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের তালিকা ধরে ধরে গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে হবে। তা হলেই খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এর আগে গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার রাত ০৯ টা ৪০ মিনিটের দিকে রূপসা উপজেলার নৈহাটী গ্রামস্থ প্রতিবন্ধী স্কুলের সামনে মামুন মীর (৩৫) নামে এক যুবক গুলি করে দুর্বৃত্তরা। মামুন মীর বাগমারা গ্রামের মৃত নিয়ামত আলী মীরের বড় ছেলে।

আহত অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণের পরামর্শ দেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মামুন মীরের শরীরে অস্ত্রপচার করা হয়েছে।

গুলিবিদ্ধ মামুন মীরের অবস্থার উন্নতি হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ৭২ ঘন্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিসাধীন রয়েছেন।

অপর দিকে, গত ১৮ আগস্ট দুপুর পৌনে ২টার দিকে নগরীর রায়েরমহল বাজারের বড় মসজিদের পাশের বাসিন্দা হাসান গাজীর চার বছরের মেয়ে মিমকে অপহরণের চেষ্টা করেন রাজু (২৬) নামের এক যুবক।

স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনি দেন। সংবাদ পেয়ে আড়ংঘাটা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজুকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।

সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা ৬টার দিকে তার মৃত্যু হয়। নিহত রাজু ফুলতলা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের নজরুল বিশ্বাসের ছেলে।

এর আগে গত ১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহল শহীদের মোড়ে আকতার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এছাড়া গত ১১ আগস্ট দিবাগত রাতে রূপসা উপজেলার নৈহাটী ইউনিয়নের মোঃ মোমিন উদ্দিনের ছোট ছেলে ফখরুল ইসলামকে (৩২) তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রূপসা ব্রিকস কার্যালয়ে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়।

এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া ইব্রাহিম কাটাপ্পাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

Ads