অভিযানের দু-এক দিন পরই ফিরে আসে আগের চিত্র, ফুটপাত ছেড়ে সড়কে হাঁটছেন পথচারীরা

তারিকুল ইসলাম শুভ, রংপুর প্রতিনিধি ঃ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ
অভিযানের দু-এক দিন পরই ফিরে আসে আগের চিত্র, ফুটপাত ছেড়ে সড়কে হাঁটছেন পথচারীরা

রংপুর নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু অভিযানের পরও পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হচ্ছে না। দু-এক দিন যেতে না যেতেই আবার আগের চেহারায় ফিরছে ফুটপাত। কোথাও ভাসমান দোকান, কোথাও স্থায়ী দোকানঘর, আবার কোথাও এলোমেলোভাবে রাখা যানবাহনে সংকুচিত হয়ে পড়ছে মানুষের চলাচলের পথ। বাধ্য হয়ে ফুটপাত ছেড়ে ব্যস্ত সড়কে হাঁটছেন পথচারীরা। এতে বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জনভোগান্তি।

নগরীর মেডিকেল মোড় থেকে জাহাজ কোম্পানি মোড় পর্যন্ত সড়কে বিকেল হলেই যানজট তীব্র আকার ধারণ করছে। হাসপাতালগামী রোগী ও তাঁদের স্বজনদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী এবং সাধারণ পথচারীদের দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে দোকানপাটের বিস্তার, ফুটপাত দখল এবং যানবাহনের চাপ মিলিয়ে নগরের স্বাভাবিক চলাচল ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশন রোড, জাহাজ কোম্পানি মোড়, সিটি বাজার, ধাপ, লালবাগ, শাপলা চত্বর, মেডিকেল মোড়, জিলা স্কুল মোড়, টাউন হল-সংলগ্ন জুলাই স্মৃতিসৌধ চত্বর, লালকুটি মোড়, খামার মেয়রের মোড় ও নেসকো অফিস মোড়সহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাতের বড় অংশ দখল হয়ে আছে। ফুটপাতজুড়ে বসেছে কাপড়, ফল, সবজি, খাবার, জুতা-স্যান্ডেলসহ নানা পণ্যের দোকান। কোথাও কোথাও গড়ে উঠেছে স্থায়ী দোকানঘরও।

ফলে যেসব ফুটপাত দিয়ে মানুষের নির্বিঘ্নে হাঁটার কথা, সেসব জায়গায় এখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পসরা। পথচারীদের কেউ কেউ সড়কের পাশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। এতে যানবাহন ও মানুষের চলাচল একই জায়গায় এসে মিশছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

উচ্ছেদের পরও ফিরে আসে আগের চিত্র

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল করে ভাসমান দোকান বসানোর বিনিময়ে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অনেক দোকানমালিক নিজেদের দোকানের সামনের ফুটপাত ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া কয়েকটি এলাকায় ভাসমান দোকানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে কয়েকটি এলাকায় ঘর, দেয়াল ও গাছের সঙ্গে মিটার বক্স ঝুলিয়ে দোকানে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে দেখা গেছে। একটি মিটার থেকে একাধিক সাবলাইন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের পাশাপাশি মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভাগের রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

শুধু ফুটপাত নয়, নগরীর শাপলা চত্বর, পায়রা চত্বর, পার্ক মোড়, মডার্ন মোড়, মেডিকেল মোড় ও ভাষা চত্বরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়কের পাশে দোকানপাট ও যানবাহনের পার্কিংয়ের কারণে চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে বেতপট্টি, লোহাপট্টি, সোনাপট্টি, হাড়িপট্টি ও দেওয়ানবাড়ী রোড পর্যন্ত পথচারীদের হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শাপলা চত্বর এলাকার বাসিন্দা আবদুল আল-মামুন বলেন, ‘ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের চলাচলের কোনো উপায় নেই। দুই পাশে ভাসমান ফল, সবজি, কাপড় ও জুতার দোকান বসায় ব্যস্ত সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। অব্যবস্থাপনার কারণে নগরজীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।’

পায়রা চত্বর এলাকার রাজু আহমেদ এবং দেওয়ানবাড়ী রোডের রাজ ও হোসেন আলী বলেন, জাহাজ কোম্পানি মোড় থেকে দেওয়ানবাড়ী রোড পর্যন্ত রাস্তার ওপর ভাসমান দোকান, ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গাড়ি পার্কিং রয়েছে। ফলে হেঁটে চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাঁদের ভাষায়, পুরো এলাকা দেখলে মনে হয় জটলাময় হাটবাজার।

অটোরিকশার চাপেও বাড়ছে ভোগান্তি

ফুটপাত ও সড়ক দখলের পাশাপাশি নগরীর যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে অটোরিকশার অতিরিক্ত চাপের কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, রংপুর মহানগরে ৬০ হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করলেও অনুমোদন রয়েছে মাত্র সাড়ে আট হাজারের। এর সঙ্গে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে কয়েক শ দোকান গড়ে ওঠায় যানজট আরও তীব্র হচ্ছে। অল্প বয়সী ছেলেদের অটোরিকশা চালানোর বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

নগরীর মুলাটোল এলাকার বাসিন্দা বেলাল মিয়া বলেন, ‘রংপুর শহরে বর্তমানে অটোরিকশার চাপ অনেক বেশি। যানজটের কারণে কচ্ছপগতিতে গাড়ি চালাতে হয়। ১০ মিনিটের রাস্তা যেতে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। চাকরিজীবীদের কর্মস্থলে পৌঁছাতেও অতিরিক্ত সময় লাগছে।’

স্থানীয় আগামীর সন্ধান পত্রিকার সম্পাদক মোনাব্বর হোসেন মনা বলেন, ‘আগের যানজটের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে রাস্তা দখল করে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও এলোমেলো গাড়ি পার্কিং। সিটি করপোরেশন ভবন এলাকা থেকে জাহাজ কোম্পানি মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে দখলের চিত্র স্পষ্ট।’

পুনর্বাসনের কথা বলছে সিটি করপোরেশন

ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন-নবী চৌধুরী বলেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক হকার জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে ব্যবসা করেন। বিকল্প কর্মসংস্থান বা নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা না করে শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিষয়টি মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন পরিকল্পিতভাবে হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। পাশাপাশি পথচারীদের চলাচল নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা হবে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জানান, ফুটপাত দখল শুধু নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, মানুষের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং নগরবাসীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. মাহবুবুর রশীদ বলেন, ‘নগরের শৃঙ্খলা ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতাও জরুরি।’

নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা নয়, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত তদারকি, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং হকারদের জন্য পরিকল্পিত বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। এতে একদিকে যেমন জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে পথচারীদের নিরাপদ চলাচল ও নগরের যানজট নিরসনেও কার্যকর অগ্রগতি আসবে।

সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: প্রথম পাতায় পাঠানোর আগে অটোরিকশার সংখ্যা, অনুমোদনের পরিমাণ, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়া ভালো। জেলা প্রশাসকের নাম এবং পদবিও প্রকাশের আগে নিশ্চিত করে নেবেন।

Ads