বোনের পুরোনো বোরকাই ভরসা ‘বাংলার ক্রিশ’ সিরাজগঞ্জের মামুন

আমিনুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি সিরাজগঞ্জ ঃ
প্রকাশিত: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
বোনের পুরোনো বোরকাই ভরসা ‘বাংলার ক্রিশ’ সিরাজগঞ্জের মামুন

সিনেমার পর্দায় দেখা সুপারহিরো ক্রিশের মতো হওয়ার স্বপ্ন। নেই দামি পোশাক, নেই আধুনিক সরঞ্জাম কিংবা বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ। তবু স্বপ্ন থেমে নেই। বোনের পুরোনো বোরকাকে ক্রিশের পোশাকে রূপ দিয়ে নিজের মতো করে
স্টান্ট অনুশীলন করে চলেছেন সিরাজগঞ্জের আল মামুন। দিনের বেলায় জীবিকার তাগিদে কাজ করেন এসএস পাইপ মিস্ত্রি হিসেবে, আর অবসর পেলেই মেতে ওঠেন সুপারহিরো হওয়ার সাধনায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার স্টান্টের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছেন ‘বাংলার ক্রিশ’ নামে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বনবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা আল-মামুনের স্বপ্ন শুধু ক্রিশের পোশাক পরা নয়, নিজের প্রতিভা দিয়ে মানুষের সামনে নতুন কিছু তুলে ধরা। সীমিত সামর্থ্য আর নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ বছর ধরে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন তিনি।

জানা যায়, মামুনের এই ব্যতিক্রমী পথচলার শুরু ডিগবাজির ভিডিও তৈরির মধ্য দিয়ে। নিজের শারীরিক কসরতের ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করলেও প্রথম দিকে তেমন সাড়া পাননি। পরে ভিন্ন কিছু করার চিন্তা থেকে বলিউডের জনপ্রিয় সুপারহিরো ক্রিশের আদলে নিজেকে উপস্থাপনের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সুপারহিরোর পোশাক তৈরি করা ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

দামি পোশাক কেনার সামর্থ্য না থাকায় বোনের পুরোনো একটি বোরকাকেই কাজে লাগান তিনি। নিজের কল্পনা আর হাতের কাজ দিয়ে সেটিকে ক্রিশের পোশাকের আদলে তৈরি করেন। এরপর সেই পোশাক পরে বিভিন্ন জায়গায় স্টান্ট ও শারীরিক কসরত দেখানোর চেষ্টা শুরু করেন। সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন রাস্তাঘাট ও দালানকোঠায় তার এমন কর্মকাণ্ড দেখতে ভিড় করেন উৎসুক মানুষ।

কেউ বিস্ময় নিয়ে দেখেন, কেউ আবার মুঠোফোনে ধারণ করেন তার স্টান্টের দৃশ্য। পরে সেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার পরিচিতি। চায়না বাঁধ-২ এলাকায় মামুনের স্টান্ট দেখতে আসা শান্তি রানী বলেন, সিনেমায় ক্রিশকে যেভাবে দেখা যায়, মামুনের স্টান্টের দৃশ্যেও তেমন মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তার চেষ্টা সত্যিই ব্যতিক্রমী। কোনো ভালো প্রতিষ্ঠান যদি তাকে সহযোগিতা করে, তাহলে সে নিজের প্রতিভা আরও ভালোভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

স্থানীয় দর্শক কাজল বলেন, মামুনের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সে যেভাবে নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করছে, তা অন্যদেরও উৎসাহিত করতে পারে। তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হলে সে আরও ভালো কিছু করতে পারবে।

মামুনের স্টান্টের ভিডিও ধারণ করেন তার বন্ধু আব্দুর রহমান। বন্ধুর স্বপ্নপূরণের এই যাত্রায় ক্যামেরা হাতে পাশে রয়েছেন তিনি। আব্দুর রহমান বলেন, মামুন কাজের পাশাপাশি ভিডিও তৈরি করে। তার সব ভিডিও আমিই ধারণ করে দিই। সে নিজের মতো করে অনেক চেষ্টা করছে। কোনো চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পেলে মামুন ভালো কিছু করতে পারবে বলে আমি মনে করি।

জীবিকার জন্য প্রতিদিন পাইপ মিস্ত্রির কাজ করতে হলেও নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসতে চান না আল-মামুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার পর এখন তার আশা, একদিন বড় পর্দায় কাজ করার সুযোগ পাবেন। নিজের প্রতিভাকে আরও বিকশিত করতে চান তিনি। এ জন্য সরকারি দপ্তর, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

আল-মামুন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে একদিন চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পেতে চাই। নিজের তৈরি এই পরিচয় নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আমার সামর্থ্য সীমিত, কিন্তু স্বপ্ন অনেক বড়। যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে নিজের প্রতিভাকে আরও ভালোভাবে তুলে ধরতে পারব।

মামুনের গল্প কেবল একজন মানুষের সুপারহিরো হওয়ার স্বপ্ন নয়, এটি নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নতুন কিছু করার চেষ্টার গল্প। দিনের পর দিন জীবিকার জন্য কাজ করার পাশাপাশি অবসরকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি।

এখন তার প্রত্যাশা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া পরিচিতি একদিন বাস্তব সুযোগে রূপ নেবে। পর্দার সুপারহিরো ক্রিশের মতো উড়তে না পারলেও নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম ও সাহস দিয়ে জীবনের মঞ্চে এগিয়ে যেতে চান সিরাজগঞ্জের এই ‘বাংলার ক্রিশ’।

Ads