৭ নভেম্বর অস্থিরতার অন্ধকার পেরিয়ে ঐক্য ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দিন

জিনিউজ ডেস্ক ২৪
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
৭ নভেম্বর অস্থিরতার অন্ধকার পেরিয়ে ঐক্য ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দিন

ঃ মোর্শেদুল ইসলাম শাজু ঃ ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অস্থির ভোর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। সেই পরিবর্তনমুখর সময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু দিন শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; জাতির রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দেওয়া একেকটি মাইলফলক। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত, তখন ঢাকার রাজপথে ঘটে যায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সেনাসদস্যদের একটি অংশের বিদ্রোহ, বন্দিদশা থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসকে নতুন এক অধ্যায়ের দিকে নিয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিতি পায়। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর বিশেষ মর্যাদার দিন। তবে দলীয় পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে ঐতিহাসিক বিচারে দিনটির গুরুত্ব আরও বিস্তৃত।এটি ছিল রাষ্ট্রের নেতৃত্ব, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার গতিপথ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

এক অস্থির সময়ের পটভূমি
৭ নভেম্বরকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৯৭৫ সালের ঘটনাবহুল দিনগুলোতে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বড় পরিবর্তন ঘটে। এর পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটে। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়।

একই সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান হত্যার শিকার হন। ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্বের সংকট, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার সেই প্রেক্ষাপটেই আসে ৭ নভেম্বর।

যে ভোরে পাল্টে গেল দৃশ্যপট
৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। সিপাহী জনতার আন্দোলনে জিয়াউর রহমান গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হন। দ্রুত বদলে যেতে থাকে ঢাকার পরিস্থিতি। এই ঘটনার পর জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব চলে আসে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের একজন সামরিক কমান্ডার থেকে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যান।

কেন ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’?
৭ নভেম্বরকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত করার মূল দর্শন ছিল জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় ঐক্যের প্রশ্নে জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংহতির প্রকাশ। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে এই ধারণা আরও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শনে রূপ নেয়। জাতীয় ঐক্য, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে বিএনপি ও এর অনুসারীদের কাছে ৭ নভেম্বর হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনায় নতুন রাজনৈতিক যাত্রার প্রতীক।

যুদ্ধের ময়দান থেকে রাষ্ট্রের নেতৃত্বে জিয়া
জিয়াউর রহমানের জাতীয় ভূমিকা শুধু ৭ নভেম্বরের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তার সামরিক নেতৃত্ব তাকে দেশের মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সেই সামরিক নেতৃত্ব এবং ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় তার আবির্ভাব; এই দুই অধ্যায় মিলিয়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনায়কসুলভ ভূমিকার একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়।

রাজনীতিকে ফেরানো হলো নির্বাচনের পথে
জিয়াউর রহমানের শাসনামলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পুনরায় সক্রিয় করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়া।

১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং একই বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন। পরের বছর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৭৯ সালে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়।

এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বহুদলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটে। দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়, যার প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান থাকে।

গ্রামবাংলার উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার
রাষ্ট্র পরিচালনায় জিয়াউর রহমানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া। খাল খনন ও পুনঃখনন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবার পরিকল্পনা, গণশিক্ষা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার নানা কর্মসূচি তার সময়ে গৃহীত হয়। তার শাসনামলে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়। উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সার্কের ভাবনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, যোগাযোগ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। তার উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সার্ক প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা- ‘সার্ক’র আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

৭ নভেম্বরের উত্তরাধিকার
ইতিহাসের বিচারে ৭ নভেম্বরের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো- এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির গতিপথে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তনের সূচনা করে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন জিয়াউর রহমান। সংকটময় পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব গ্রহণের পর তিনি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, নির্বাচন আয়োজন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং জাতীয়তাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় একাধিকবার দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি দলটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে চলেছে।

ইতিহাসের আয়নায় জিয়াউর রহমান
জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তার বহুমাত্রিক ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতার ঘোষক, সামরিক কর্মকর্তা, ১৯৭৫ সালের সংকটকালে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসা রাষ্ট্রনায়ক এবং পরবর্তী সময়ে একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা।

বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের গভীর সংকটের পর বাংলাদেশকে নির্বাচনী রাজনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে গুরুত্ব দেওয়া এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

৭ নভেম্বর একটি দিনের চেয়েও বেশি
৭ নভেম্বর তাই শুধু অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয় রাজনীতি ও নেতৃত্বের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এক অস্থির সময়ের ভেতর থেকে উঠে এসে জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ধারার সূচনা করেছিলেন, তার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

আজ ৭ নভেম্বর ফিরে দেখার অর্থ শুধু অতীত স্মরণ করা নয়; বরং একটি সংকটময় সময় থেকে বাংলাদেশ কীভাবে নতুন রাজনৈতিক পথের দিকে এগিয়ে গেল, সেই ইতিহাসকে অনুধাবন করা।

জাতীয় জীবনের সেই সন্ধিক্ষণে ৭ নভেম্বর ছিল পরিবর্তনের দিন; আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে এসেছিলেন জিয়াউর রহমান। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ও জিয়াউর রহমান; দুটি নামই পরস্পর গভীরভাবে সংযুক্ত।

লেখক : মোর্শেদুল ইসলাম শাজু , সভাপতি, হোমনা উপজেলা প্রেসক্লাব।
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব যা সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয় ।)

Ads