দেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলার দৃষ্টান্তমূলক সাজার নজির নেই

জিনিউজবিডি২৪ ডেস্ক ঃ
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ২:৫০ অপরাহ্ণ
দেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলার দৃষ্টান্তমূলক সাজার নজির নেই

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির অভিযোগ বাড়ছে। এরই মধ্যে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কয়েকজন সাংবাদিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা শুরু হয়। আহতদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন ও গণমাধ্যমকর্মী তোফায়েল আহমেদ। তোফায়েল আহমেদ বলেন, তিনি মাদকবিরোধী অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করতে সেখানে যান।

পরিস্থিতি হঠাৎ কোনও কারণ ছাড়াই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে, এক পর্যায় তাকেও মারধর করা হয়। ঘটনার সময় উপস্থিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম পুরো ঘটনাকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করেছেন।

তিনি বলেন, অভিযানের সময় এক মাদকসেবীর হামলায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হন। এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কয়েকজন সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীর ওপর মারধরের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশ সূত্র জানায়, এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে আইনের ব্যত্যয় ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এখনও এ ঘটনায় কোনও মামলা হয়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এর আগে শহিদ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিতে লাইভ চলাকালীন এক মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টারকে লাথি মেরে ফেলে দেয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২১৮ জন সাংবাদিক হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।

হাইকোর্টের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, পুলিশের ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের সীমা ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি, পুলিশ রেগুলেশনস ও সংবিধানে নির্ধারিত। বলপ্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয়, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সীমিত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শক্তি প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয় এবং গণমাধ্যম কর্মীদের নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’র নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম চ্যানের 24 অনলাইনকে বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অভিযান ও টহল প্রয়োজন হলেও মারমুখী আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে সাংবাদিকদের ওপর অন্তত ৩১৮টি হামলায় ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় তিনজন নিহত, ২৭৩ জন আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত, ৮৩ জন হুমকি ও ১৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ ছাড়া ৩৪টি মামলায় ১০৭ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।

অন্য এক প্রতিবেদনে সংগঠনটি জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১৭ মাসে দেশে সাংবাদিকদের ওপর অন্তত ৪২৭টি হামলায় ৮৩৪ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এতে ছয়জন নিহত, ৩৭৯ জন আহত, ১০৩ জন হুমকি ও ৩৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ৪৯টি মামলায় ২২২ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, কোথাও কোনও সাংবাদিক হামলা বা নির্যাতনের শিকার হলে সংগঠনটি তাদের পাশে দাঁড়ায় এবং ভুক্তভোগী সাংবাদিক যেন ন্যায়বিচার পান, সে লক্ষ্যে কাজ করে।

তিনি বলেন, সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসি। হামলা, হুমকি বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকি।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেছেন, দেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনা নতুন নয়; অতীতেও বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। সাগর-রুনিসহ অনেক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অনেককে বিভিন্নভাবে হয়রানিমূলক মামলাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের হত্য-নির্যাতনের অপরাধীদের এখন পর্যন্ত কোনও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়নি। যদি দৃষ্টান্তমূলক সাজা হতো, তাহলে হয়তো এমন ঘটনা আর ঘটত না।

কোনও সাংবাদিক হামলা বা হয়রানির শিকার হলে সংগঠনের ভূমিকা কী— এ বিষয়ে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানোই সংগঠনের দায়িত্ব। কোনও সাংবাদিক যদি কোনোভাবে হয়রানি বা হামলার শিকার হন, আমরা এর প্রতিবাদ জানাই এবং ভুক্তভোগী ওই সাংবাদিককে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকি।

হামলার পর মামলা দায়েরের বিষয়ে ডিআরইউ সভাপতি বলেন, সংগঠন সরাসরি মামলা করে না। তবে ভুক্তভোগী সাংবাদিক মামলা করলে সংগঠন তার পাশে থাকে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা জোরদারে উদ্যোগের কথাও জানান আবু সালেহ আকন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় ইতোমধ্যে ইউনেসকোর সঙ্গে ডিআরইউ একটি চুক্তি করেছে। এর আওতায় একটি হেল্প ডেস্ক চালু হয়েছে। কোনও সাংবাদিক হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হলে আমরা এই হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে তাকে সহায়তা করব।

সূত্রঃ চ্যানেল ২৪

Ads