খুলনার দিঘলিয়ায় প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা

গাজী যুবায়ের আলম, ব্যুরো প্রধান খুলনা ঃ
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ
খুলনার দিঘলিয়ায় প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গাপূজা শুরু হতে চলেছে। শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে নিয়ে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনাহটি পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।

দিঘলিয়া উপজেলায় এ বছর ৬১টি পূজামন্ডপে দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। তাইতো দিন রাত শ্রম দিয়ে দেবী দূর্গা, গনেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতীসহ প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা তৈরির কাজে নিয়োজিত ভাষ্করগণ।

প্রতিটা মন্দিরের প্রতিমা তৈরির কাজে কারিগরদের সামনে সময় কম, তাই দিন-রাত ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে চলেছেন প্রতিমা তৈরির কারিগররা। কাদামাটি দিয়ে গড়া দেবী দূর্গার প্রতিমায় ভরে উঠছে সেনহাটি পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের বাসস্থান।

কোনো কোনো বাড়িতে চলছে প্রতিমাগুলোতে দো-মাটির কাজ। সাথে সাথে শেষ মুহূর্তে প্রতিমা তৈরি ও রং তুলির কাজ শেষ করার ব্যস্ততায় দিনপার করছে মৃৎশিল্পীরা।
কাদা-মাটি, নিপুণ হাতের ছোঁয়া আর শিল্পের কারুকাজে ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দুর্গাপ্রতিমাসহ নানা ধরনের মাটির সামগ্রী।

তবে প্রতিমা ও মাটির সামগ্রী তৈরির ব্যস্ততা বাড়লেও কাঁচামাল, রং ও সাজসজ্জার খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা।

উপজেলার পালপাড়ার কারিগর সুমীর চন্দ্র পাল এ প্রতিবেদককে জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর মাটির সামগ্রী তৈরির খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি আয়। ফলে পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি মাটি দিয়ে প্রায় ৩২ ধরনের সামগ্রী তৈরি করেন। এসবের মধ্যে রয়েছে রসুন, ঝিঙা, বেগুন, আপেল, বেল, আম, টমেটো, স্ট্রবেরি, লিচু, কলা, কামরাঙা, করলা, পটল, ডাব ও নারকেলসহ বিভিন্ন ফলমূল ও সবজির প্রতিরূপ। তাঁর তৈরি এসব সামগ্রী খুলনার নিউমার্কেট, ফুলতলা ও বিভিন্ন হাটবাজারের পাশাপাশি বগুড়ার পালপাড়া এলাকাতেও সরবরাহ করা হয়।

একই এলাকার আরেক মৃৎশিল্পী সত্য পাল মাটি দিয়ে তৈরি করেন কলস, চুলা, পাটা, হাঁড়ি, কুলা, জগসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা সামগ্রী। পাশাপাশি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাঁরা।

মৃৎশিল্পী বিকাশ পাল এ প্রতিবেদককে জানান, গত বছরের মতো এ বছরও তিনি দুর্গাপ্রতিমার দুটি সেট তৈরির কাজ হাতে নিয়েছেন। বর্তমানে প্রতিমাগুলোতে রং করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। খরচ বেড়ে যাওয়ায় আরও প্রতিমা তৈরির ইচ্ছা থাকলেও পর্যাপ্ত অর্ডার না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। তাই সীমিত ফরমায়েশ নিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

পালপাড়ার জয়মতি পালও মাটির সামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে মাটির গরু, তাল, ব্যাংক, ঘোড়া ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিমাসহ নানা উপকরণ। এসব সামগ্রী তৈরি ও বিক্রির মধ্য দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

দিঘলিয়ার সেনহাটি পালপাড়ার এসকল মৃৎশিল্পীদের কাছ থেকে জানা যায়, মাটির কাজ শুধু জীবিকা নয়, এটি তাঁদের বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখাতেই তারা মৃৎশিল্পের এই কাজ করে আসছেন। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে তাঁদের কর্মব্যস্ততা বাড়লেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে আবার অর্ডারের সীমাবদ্ধতা এবং লাভের অনিশ্চয়তা তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে।

শিল্পীদের আশঙ্কা, এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে মাটির সামগ্রী ও প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, তাঁদের কাজের উপযুক্ত মূল্য দেওয়া এবং ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের প্রসারে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করছেন তাঁরা।

মাটির ছোঁয়ায় দুর্গাপ্রতিমা যখন পূজামণ্ডপে দেবীর আগমনের বার্তা বহন করবে, তখন সেই সৌন্দর্যের পেছনে থাকবে পালপাড়ার শিল্পীদের নিরলস শ্রম, সৃজনশীলতা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প।

এ বছরে দিঘলিয়া উপজেলায় ৬১টি পূজামন্ডপে অনুষ্ঠিত দূর্গাপূজার সময় যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক থাকে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকে সে বিষয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দিঘলিয়া পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাগণ বিশেষ ভূমিকা পালন করবেন বলে জানা গেছে। পূজা উদযাপন উপলক্ষে আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর কোনো সম্ভাবনা নেই এমনটাই জানিয়েছেন বিভিন্ন মহল।

Ads